ট্রাম্পের নতুন সিদ্ধান্ত: H-1B ভিসার জন্য ১ লাখ ডলারের ফি

বিদেশ11 months ago151 Views

অনলাইন ডেস্ক | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের জন্য সবচেয়ে আলোচিত ভিসা হলো H-1B। প্রযুক্তি কোম্পানি থেকে শুরু করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান—প্রতিভাবান কর্মীদের নিয়োগের জন্য এই ভিসা ব্যবহার করে আসছে কয়েক দশক ধরে। এবার সেই ভিসার ওপরই কঠিন শর্ত চাপিয়ে দিল ট্রাম্প প্রশাসন।

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে যে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি H-1B ভিসায় বিদেশি কর্মী আনতে চায়, তবে প্রতি আবেদনের জন্য তাদের দিতে হবে ১ লাখ মার্কিন ডলারের ফি। এই বিশাল অঙ্কের অর্থপ্রদান নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনা।

কী বলা হয়েছে প্রশাসনের ঘোষণায়

প্রেসিডেন্টিয়াল প্রোক্লেমেশনে বলা হয়েছে, নতুন এই ফি অবিলম্বে কার্যকর হবে। একইসঙ্গে বিনিয়োগকারী বিদেশিদের জন্য চালু করা হবে একটি নতুন ভিসা ক্যাটাগরি, যার নাম দেওয়া হয়েছে “গোল্ড কার্ড”। যারা যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করতে পারবেন, তারা এই গোল্ড কার্ডের মাধ্যমে দ্রুত গ্রিন কার্ড ও নাগরিকত্বের পথে এগোতে পারবেন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির বাজার আরও সুরক্ষিত হবে এবং কেবলমাত্র উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন কর্মীরাই সুযোগ পাবেন।

কেন এই সিদ্ধান্ত?

প্রশাসনের যুক্তি হলো—

  • স্থানীয়দের চাকরি বাঁচানো: দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছিল, অনেক H-1B কর্মী তুলনামূলক কম বেতনে কাজ করেন, ফলে আমেরিকানদের চাকরি হুমকির মুখে পড়ছে।
  • দক্ষতার মান বজায় রাখা: এত বড় ফি দেওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র সেরা প্রার্থীকেই বেছে নিতে চাইবে।
  • অপব্যবহার বন্ধ করা: অভিযোগ রয়েছে, কিছু কোম্পানি এই ভিসা ব্যবহার করে নবীন বা তুলনামূলক কম দক্ষ কর্মী নিয়ে আসে। নতুন ফি দিয়ে সেই অপব্যবহার বন্ধ হবে বলে আশা করছে প্রশাসন।

সমালোচকরা কী বলছেন

তবে প্রযুক্তি খাত ও বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে উল্টো ফল বয়ে আনবে।

  • সিলিকন ভ্যালির ক্ষোভ: বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর বিদেশি প্রতিভার ওপর নির্ভর করেছে। গুগল, মাইক্রোসফট কিংবা অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠান বলছে, ১ লাখ ডলারের অতিরিক্ত খরচ তাদের জন্যও চাপের, আর ছোট স্টার্ট-আপগুলোর জন্য এটি প্রায় অসম্ভব।
  • প্রতিভা হারানোর ঝুঁকি: ভারত, চীন এবং দক্ষিণ এশিয়ার হাজার হাজার দক্ষ কর্মী H-1B ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে আসেন। খরচ এত বেড়ে গেলে তারা হয়তো কানাডা, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে চলে যাবেন।
  • আইনি প্রশ্ন: মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী এ ধরনের বড়সড় ফি সাধারণত কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কার্যকর করা যায় না। ফলে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

প্রবাসী সমাজের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ-তরুণীরা যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগের জন্য H-1B ভিসার দিকে তাকিয়ে থাকেন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাদের স্বপ্ন বড় ধাক্কা খেতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত এক বাংলাদেশি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অনলাইনে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, “এই ফি যদি সত্যিই কার্যকর হয়, তবে মাঝারি আকারের কোম্পানি আমাদের মতো প্রার্থীদের আর নেবে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমরাও, ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রও।”

সম্ভাব্য প্রভাব

ক্ষেত্রপ্রভাব
কোম্পানির খরচনিয়োগ ব্যয় বহুগুণে বেড়ে যাবে, ছোট স্টার্ট-আপের পক্ষে এটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
বিদেশি কর্মীভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিভাবান কর্মীরা বিকল্প দেশ বেছে নিতে পারেন।
স্থানীয় শ্রমবাজারঅল্প সময়ে সুযোগ বাড়তে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিঅভিবাসী-বান্ধব দেশের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আইনি পরিস্থিতিকংগ্রেস ও আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াই শুরু হতে পারে।

অর্থনৈতিক দিক

গড়ে একটি মাঝারি প্রযুক্তি কোম্পানি প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ জন H-1B কর্মী রাখে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী শুধু ফি বাবদই তাদের খরচ হবে কয়েক মিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে ভিসা প্রক্রিয়া, আইনজীবী ও প্রশাসনিক খরচ যোগ করলে বোঝাই যাচ্ছে, এই ব্যয় বহন করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান হয়তো বিদেশে অফিস খুলে প্রতিভা কাজে লাগাবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বাড়ার পরিবর্তে উল্টো কমে যেতে পারে।

সামনে কী হতে পারে

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘোষণাটি নিয়ে আদালতে মামলা হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ, প্রেসিডেন্ট নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে এ ধরনের বিশাল ফি আরোপ করতে পারেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন দৃঢ়ভাবে বলছে, তারা স্থানীয় কর্মীদের রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। তাই আগামী কয়েক মাসে আইনি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দিতে পারে।

H-1B ভিসা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি। সারা বিশ্ব থেকে আসা প্রতিভারা এই ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বে প্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অর্থনীতির শীর্ষে তুলে ধরতে সাহায্য করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ফি আরোপ সেই ভিসাকে আরও ব্যয়বহুল, সীমিত এবং বিতর্কিত করে তুলছে। যদিও প্রশাসনের দাবি, এটি আমেরিকান চাকরি রক্ষার পদক্ষেপ, তবে সমালোচকদের মতে এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিভার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।

সব নজর এখন কংগ্রেস ও আদালতের দিকে—এই সিদ্ধান্ত টিকবে, নাকি রাজনৈতিক ও আইনি চাপে পরিবর্তিত হবে, সেটিই দেখার বিষয়।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

    Join Us
    • Facebook
    • Youtube
    Deal Of The Month
      Categories

      Advertisement

      Loading Next Post...
      Follow
      Search Trending
      Popular Now
      Loading

      Signing-in 3 seconds...

      Signing-up 3 seconds...