ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি কিভাবে এসেছে ?

মাওলানা হসরত মোহানি ও ভগত সিং। ছবি উইকিপিডিয়া ও উইকিমিডিয়ার সৌজন্যে।

ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু শব্দ কেবল স্লোগান নয়, যুগের চেতনা ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে। “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” তেমনই এক উচ্চারণ—যার ভেতরে আছে বিপ্লবের স্বপ্ন, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আবার পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক ধারার নিজস্ব ব্যাখ্যাও। আজও এই স্লোগান শোনা গেলে মানুষের মনে ভেসে ওঠে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, তরুণ বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দৃশ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শব্দটি ভারতীয় উপমহাদেশে কীভাবে এলো? কারা এটি ব্যবহার করেছে? এবং কেন এটি এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল?

শব্দের উৎস ও অর্থ

“ইনকিলাব জিন্দাবাদ” শব্দটি মূলত উর্দু-ফারসি ভাষার সমন্বয়। ইনকিলাব অর্থ বিপ্লব , জিন্দাবাদ অর্থ দীর্ঘজীবী হোক বা চিরজয়ী হোক। অর্থাৎ, পুরো বাক্যটির মানে দাঁড়ায়— “বিপ্লব চিরজীবী হোক” বা “বিপ্লবের জয় হোক”। এই স্লোগানটি উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা পায় মূলত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯২০-এর দশকে এর রাজনৈতিক ব্যবহার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

হসরত মোহানির ভূমিকা

“ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানটির প্রাথমিক রাজনৈতিক প্রচলনের কৃতিত্ব সাধারণত দেওয়া হয় উর্দু কবি ও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী মওলানা হসরত মোহানি-কে। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাংবাদিক এবং ব্রিটিশবিরোধী কর্মী। ১৯২১ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কাছ থেকে—অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য-এর শাসন থেকে ভারতের সম্পূর্ণ মুক্তি চেয়েছিলেন। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত সাহসী অবস্থান। তাঁর রাজনৈতিক ভাষণে এবং লেখায় “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” ধ্বনি উঠে আসে। মোহানির কাছে ‘ইনকিলাব’ মানে ছিল কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়; সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের অবসানও। তাই তাঁর ব্যবহৃত স্লোগানটি ছিল সামগ্রিক পরিবর্তনের ডাক।

ভগত সিং ও বিপ্লবী রাজনীতি

তবে এই স্লোগানকে জনমানসে অমর করে তোলেন বিপ্লবী নেতা ভগত সিং এবং তাঁর সহযোদ্ধারা। ১৯২৯ সালে দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের পর ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত আদালতে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে স্লোগান দেন — “ইনকিলাব জিন্দাবাদ!”

ভগত সিংয়ের সংগঠন হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্টভাবেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিল। তাঁদের কাছে ‘ইনকিলাব’ মানে শুধু ব্রিটিশ শাসনের পতন নয়, শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ গঠন। আদালতে দাঁড়িয়ে ভগত সিং যখন বলেন “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”, তখন তা কেবল প্রতিবাদ নয়—এক রাজনৈতিক দর্শনের ঘোষণা।

১৯৩১ সালে ভগত সিংয়ের ফাঁসির আগে ও পরে এই স্লোগানটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রসমাজ, শ্রমিক সংগঠন, এমনকি সাধারণ মানুষের মুখেও ধ্বনিত হতে থাকে—“ইনকিলাব জিন্দাবাদ”।

কংগ্রেস, বামপন্থী ও অন্যান্য ধারায় ব্যবহার

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ছিল প্রধান রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। যদিও কংগ্রেসের মূলধারার নেতৃত্ব—যেমন মহাত্মা গান্ধী—অহিংস অসহযোগ ও সত্যাগ্রহের পথ বেছে নিয়েছিলেন, তবু কংগ্রেসের ভেতরেও তরুণ কর্মীদের মধ্যে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলিও এই স্লোগানকে নিজেদের রাজনৈতিক ভাষ্যের অংশ করে নেয়। শ্রমিক ধর্মঘট, কৃষক আন্দোলন কিংবা ছাত্র রাজনীতিতে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” হয়ে ওঠে সংগ্রামের ডাক।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় এটি ছিল এক ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের প্রতীক। ধর্ম, ভাষা বা অঞ্চলের পার্থক্য ছাড়িয়ে এই স্লোগান মানুষকে একত্র করেছিল—কারণ এর কেন্দ্রে ছিল স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের দাবি।

দেশভাগের পরের প্রেক্ষাপট

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। দেশভাগের পরও “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানটি দুই দেশেই বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিসরে ব্যবহৃত হতে থাকে।

ভারতে বামপন্থী রাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন, জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—সব ক্ষেত্রেই এই স্লোগান শোনা গেছে। পাকিস্তানেও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-এর মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী বামপন্থী আন্দোলনেও “ইনকিলাব” শব্দটি রাজনৈতিক ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যদিও সরাসরি “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানটি সেখানে ততটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি।

স্লোগানের রূপান্তর ও বিতর্ক

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” নানা রাজনৈতিক শক্তি ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছে। কারও কাছে এটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতীক, কারও কাছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক, আবার কারও কাছে কেবল ঐতিহাসিক স্মারক।

কিছু ক্ষেত্রে এই স্লোগান বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যখন রাষ্ট্রবিরোধী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে এটি ব্যবহৃত হয়েছে, তখন শাসকগোষ্ঠী একে সন্দেহের চোখে দেখেছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এর মূল উৎস ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রাম।

সাংস্কৃতিক প্রভাব ও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বিতর্ক

“ইনকিলাব জিন্দাবাদ” কেবল রাজনৈতিক মঞ্চেই নয়, সাহিত্য, নাটক, সিনেমা ও সংগীতে স্থান পেয়েছে। ভগত সিংকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র বা নাটকে এই স্লোগান আবেগঘন মুহূর্ত সৃষ্টি করে। কবিতায় ও গণসংগীতে এটি প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে ফিরে আসে বারবার। এভাবে একটি রাজনৈতিক স্লোগান ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তরুণদের মধ্যে এই স্লোগানটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে ওই আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা ছাত্রদের সংগঠন “জাতীয় নাগরিক পার্টি”-র অন্যতম মূল স্লোগান হয়ে ওঠে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”। অনেকে ভুল করে এটিকে পাকিস্তানপন্থী স্লোগান মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এই স্লোগানটির ঐতিহাসিক সূচনা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে।

উপসংহার

“ইনকিলাব জিন্দাবাদ” কোনো একক ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়; এটি একটি সময়ের, একটি সংগ্রামের ফসল। মওলানা হসরত মোহানি-র কলম থেকে শুরু হয়ে ভগত সিং-এর কণ্ঠে তা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় এর ব্যবহার বদলালেও এর ঐতিহাসিক শিকড় ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের মাটিতেই প্রোথিত।

আজও যখন কোথাও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়, তখন “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” ধ্বনি শোনা যায়। শব্দদুটির ভেতরে তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও জীবিত। ইতিহাসের পাতা থেকে রাস্তাঘাট—এই স্লোগান উপমহাদেশের রাজনৈতিক চেতনায় এক অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছে।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...