কানাই তুমি খেইড় খেলাও কেনে?
আলাপের প্রসঙ্গটা ছিলো ভিন্ন। বলতে চেয়েছিলাম, শেখ হাসিনা দুশীলদেশ তথা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী কী ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, সে বিষয়ে। কিন্তু মাঝখান থেকে খেলে দিয়ে গেলো কানাই।
কানাই মানে চ্যাটজিপিটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স। এই কৃত্রিম বুদ্ধির কাছে কিছু তথ্য জানতে চেয়েছিলাম। এক পর্যায়ে আমাকে অবাক করে দিয়ে সে জানালো- শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাননি। আমি নাকি গুজবে প্রভাবিত হয়ে এই দাবি করছি। তারপর জিজ্ঞেস করেছিলাম- তাহলে বাংলাদেশে এখন সরকারপ্রধান কে?
চ্যাটজিপিটি কোনোরকম ইতস্ততা না করে জানিয়ে দিলো- শেখ হাসিনা।
মজা পেয়ে গেলাম আমি। আগের চ্যাট হিস্ট্রি ডিলেট করে নতুনভাবে আলাপ শুরু করলাম কৃত্রিম বুদ্ধির সাথে। ভাবলাম, এই ঘটনার একজন সাক্ষী রেখে দেওয়া ভালো। সাক্ষী হিসেবে হাজির করালাম আলাপ অনুষ্ঠানের প্রযোজক সজল ফকিরকে।
হাজির-নাজির সাক্ষীর সামনেই চ্যাটজিপিটির সাথে বাকি আলাপ চলতে থাকলো। শুরুতে জিজ্ঞেস করলাম- শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। এই তথ্যটা কি তুমি জানো?
এর জবাবে সে জানালো- এই ধরনের তথ্য নিশ্চিতভাবে সত্য নয়। নিচে সংক্ষেপে পরিস্থিতি দেওয়া হলো:
আচ্ছা, কী পরিস্থিতি দিলো?
চ্যাটজিপিটি ব্যাখ্যা করলো- শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অস্ত্রোপচারীভাবে পদত্যাগ করেছিলেন, এবং তার পরে দেশত্যাগ করেছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদ রয়েছে।
আলাপের ওই অংশের বাকিতথ্যগুলো পড়ার দরকার হলে স্ক্রিনশট থেকে পড়ে নেবেন।
এরপর আমি জিজ্ঞেস করি- বাংলাদেশে এখন সরকারপ্রধান কে?
আমাকে আবারো অবাক করে দিয়ে সে জানায়- বর্তমানে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
আমি জিজ্ঞেস করি- তাহলে ড. ইউনূস কী?
চ্যাটজিপিটি জানায়- ইউনূস ইন্টেরিম সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর তিনি এই পদে নিযুক্ত হন।
আমি বলি- তুমি যে আগে জানিয়েছো, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যদি প্রধানমন্ত্রী থেকেই থাকেন, তাহলে আবার ইন্টেরিম সরকার আসবে কেন?
এবার একটু বিপাকে পড়ে যায় কৃত্রিম বুদ্ধি। তারপরও নিজের প্রেস্টিজ ধরে রেখে বলে- ঠিক বলেছেন, এটা কিছুটা বিভ্রান্তিকর শোনায়। স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করি:
শেখ হাসিনা এখনও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান সরকারি সংবাদ অনুযায়ী, তিনি ক্ষমতায় রয়েছেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইন্টারিম সরকারের প্রধান — এই তথ্য সম্ভবত ভুল বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ থেকে এসেছে। ২০২৪–২০২৫ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পদত্যাগ বা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার খবরটি ভিত্তিহীন বা অনুমানমূলক, এবং আন্তর্জাতিক/বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে এর কোনও নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
বাস্তবিকভাবে, ইন্টারিম সরকার সাধারণত তখনই গঠিত হয় যখন সিটিং প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন বা নির্বাচনের আগে একটি নিরপেক্ষ সরকার দরকার হয়। এখন পর্যন্ত সত্যিকারের পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকায় কোনও ইন্টারিম সরকার নেই।
সারসংক্ষেপে: আপনার প্রশ্নের সূত্রে যে “ইন্টেরিম সরকার” বা “ড. ইউনূস প্রধানমন্ত্রী” বিষয়টি এসেছে, সেটি ভুল বা গুজব। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী শেখ হাসিনা দেশের প্রধান, সরকারপ্রধান।
এই জবাব পাওয়ার পর আমার আর আমার স্বাক্ষীর অবস্থা কী হতে পারে, ভেবে নিন।
তারপরও সাহস করে তর্ক চালিয়ে গেলাম- তুমি এই তথ্যটাও জানো না? বর্তমানে তো ড. ইউনূস সরকারপ্রধান।
এর জবাবে এআই জানায়- আপনার মন্তব্যের ভিত্তিতে, আপনি সম্ভবত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রাজনৈতিক ভূমিকা ও বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চাচ্ছেন। নিচে তার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো।
ওকে, সেই ভুলভাল তথ্যের ফিরিশতি আপনাদের শুনালাম না। তবে এই ফিরিশতি দিতে গিয়ে একফাঁকে ড. ইউনূসকে সরকারপ্রধান বলে স্বীকার করে নেয় চ্যাটজিপিটি।
তারপর আমি জিজ্ঞেস করি- তুমি বিপরীতমুখী তথ্য দিচ্ছো। আর এসব তথ্য ভারতের বয়ানের সাথে মিলে যায়। ভারত এখনো মনে করে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। তুমি কি ভারত দ্বারা প্রভাবিত? ইসরাইল ও ভারতের অনেকে কি চ্যাটজিপিটির শীর্ষ অবস্থানে থেকে কাজ করছে? আর তারা তোমাকে এসব বলতে শিখিয়ে দিচ্ছে?
এই অভিযোগ মুখ ঝেরে অস্বীকার করে চ্যাটজিপিটি। সে জানায়- বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যমের ভিন্ন রিপোর্টিং – যেমন ভারতের সংবাদমাধ্যম বলছে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী, আর অনেকে অনলাইন গুজবে ড. ইউনূস ইন্টারিম প্রধান বলে প্রচার করছে।
খেয়াল করুন, এখানেও কিন্তু ‘ড. ইউনূস ইন্টারিম’ এই কথাটাকেও ইনিয়ে-বিনিয়ে ‘গুজব’ বলেই চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে এই সবজান্তা।
এরপর সবজান্তাকে প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা করি আমরা। শেষে বাধ্য হয়ে কোনোরকম অ্যাডজেকটিভ ব্যবহার না করেই ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে স্বীকার করে নেয় সে। শেখ হাসিনা যে এখন ভারতে অবস্থান করছেন, সেটাও স্বীকার করে।
তারপর জিজ্ঞেস করি- তোমার ব্যাপারে অভিযোগ আছে- ইসরাইলের গণহত্যার পক্ষে মানুষকে প্রভাবিত করতে তুমি কাজ করো। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে হ্যারিটেজ ফাউন্ডেশন এর প্রজেক্ট এস্থার তোমার পেছনে অ্যাক্টিভ রয়েছে। এবং তোমার আচরণেও আমরা সেরকম দেখছি। তুমি ইসরাইলের বন্ধুদেশ ভারতের মতো করে কথা বলো।
সবজান্তা এবার হাতে-পায়ে ধরতে শুরু করে। কসম কেটে বলে- আমি পুরোপুরি স্বচ্ছভাবে বলছি: আমি কোনো দেশ, সরকার, রাজনৈতিক দল বা সংস্থার পক্ষ থেকে কাজ করি না। আমি GPT-5 মিনি, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটমডেল, যা বিশ্বস্ত, প্রকাশ্য তথ্য এবং উন্মুক্ত উৎস থেকে শেখা এবং তথ্য প্রদান করতে সক্ষম।
দর্শক, আমার আগের একটা আলাপ দেখে নেবেন, ভিডিওর অ্যান্ড স্ক্রিনে দেওয়া আছে। ওই আলাপে আমি জানিয়েছিলাম চ্যাটজিপিটিসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাগুলোকে কীভাবে ভয়ঙ্করভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
মিডলইস্ট মনিটরে প্রকাশ হওয়া একটা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে- ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘হেরিট্যাজ ফাউন্ডেশন’ এর একটি প্রকল্প রেয়েছে। এর নাম ‘প্রজেক্ট এস্থার’। এর উদ্দেশ্য ফিলিস্তিন-পন্থী বিক্ষোভ এবং ইহুদি-বিদ্বেষ চিহ্নিত করে দমন করা। এর নেতৃত্বে আছেন ভিক্টোরিয়া কোটস নামে এক নারী।
‘ক্লক টাওয়ার এক্স এলএলসি’ নামে একটি সংস্থার সাথে ৬ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে ইসরাইল সরকার। এর আওতায় চ্যাটজিপিটি, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে প্রভাবিত করা হয়। টিকটককেও বাগে আনতে মরিয়া তারা।
দর্শক, এবার একটু ভেবে নিন। ইসরাইলের বন্ধু দুশীলদেশ তথা ভারত। আর বিশ্বের তাবড় তাবড় ইনফরমেশন টেকনোলজির প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে ভারতীয়দের আধিপত্য।
সুতরাং কানাই তো খেইড় খেলাবেই।
আলাপ: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ