জাতীয় সংগীত পরিবর্তনে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ: কী ছিল গোপন চিঠিতে? 

‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারত ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতও নেওয়া হয়েছে তার লেখা থেকে। অন্য দুই দেশের সংগীত নিয়ে বিতর্ক না থাকলেও বাংলাদেশে এই গানটিকে বাদ দেওয়ার আলোচনা হয়েছে বহুবার। আনা হয়েছে রাজনৈতিক প্রস্তাবও। পড়ুন ইনফোজা প্রতিবেদন।

Rabindranath Tagore sketch with Bangladesh landscape and national anthem lyrics
‘আমার সোনার বাংলা’র মোট পঁচিশ চরণ থেকে প্রথম ১০ চরণ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন হলে এর ৪.১ অনুচ্ছেদে ‘আমার সোনার বাংলা’র মোট পঁচিশ চরণ থেকে প্রথম ১০ চরণ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। পরে রাষ্ট্রপতি হন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের উদ্দেশে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. দ্বীন মুহাম্মদকে ওই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়। কমিটিকে বলা হয় এক মাসের মধ্যে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নতুন কোনো গান প্রস্তাব করতে। বিষয়টি নিয়ে তিনটি বৈঠক করেন দ্বীন মুহাম্মদ। ওই কমিটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে দুইটি বিকল্প উপস্থাপন করে। একটি হলো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’। অন্যটি ফররুখ আহমেদের ‘পাঞ্জেরী’।  কিন্তু তখনকার রাজনৈতিক অস্থিরতায় জাতীয় সঙ্গীতের বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।

দ্বিতীয়বার উদ্যোগ নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের ৩০ এপ্রিল ‘আমার সোনার বাংলা’ বাদ দিয়ে ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানটিকে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করা হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সংরক্ষিত ওই সময়কার নথিতে আছে, জিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান এক গোপন চিঠিতে লেখেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি গান ভারতীয় জাতীয় সংগীত। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক নন। আমার সোনার বাংলা গানটি আমাদের সংস্কৃতির চেতনার পরিপন্থি বিধায় জাতীয় সংগীত পরিবর্তন আবশ্যক।”

ওই চিঠিতে ‘আমার সোনার বাংলা’র পরিবর্তে ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’ কে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করেন শাহ আজিজুর রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর ওই চিঠি পেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রেডিও, টেলিভিশন এবং সব সরকারি অনুষ্ঠানে প্রথম বাংলাদেশ গানটি প্রচারের নির্দেশনাও জারি করে।

এসময় রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি প্রথম বাংলাদেশ গাওয়া শুরু হয়।  কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হলে সেই উদ্যোগ থেমে যায়। চাপা পড়ে যায় সেই নিদের্শনা।

২০০০ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রকাশ্য সমাবেশে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি তুলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আফতাব আহমেদ। তার এই বক্তব্যকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ছাত্রলীগ ও বাম ছাত্রসংগঠনগুলো তার অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়। ড. আফতাবকে ৩ মাসের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

২০০১ সালের শেষের দিকে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর ২০০৩ সালে ড. আফতাব আহমেদকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনে তৃতীয় দফা উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়। ২০০২ সালের ১৯ মার্চ তখনকার শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের উদ্দেশে একটি যৌথ সুপারিশপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেন। ওই চিঠিতে বলা হয়, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত সংশোধিত হওয়া প্রয়োজন। তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই অনুরোধপত্রটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠান।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী খুরশীদ জাহান হক বিষয়টি ‘অতি গুরত্বপূর্ণ’ বলে সচিবের কাছে পাঠিয়ে দেন। জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার বহির্ভূত’ উল্লেখ করে সেটা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়ে দেন সচিব। একই বছরের ১৯ আগস্ট প্রস্তাবটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।  সেই সরকারের আমলেই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি। এর পর জাতীয় সঙ্গীত বিষয়ে সরকারি নথিতে আর কোনো তৎপরতা পাওয়া যায়নি।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...