গাজার শিশুরা কেন ইহুদিবাদীদের টার্গেট? শিশুহত্যার ‘বৈধতা’ খুঁজেন নেতানিয়াহু

ধ্বংস-উপত্যকা গাজায় শিশুদের নিরাপত্তা নেই। নীরবতা নেই, বিরতি নেই। আছে কেবল পালিয়ে যাওয়ার তাড়া। বোমা তাদের তাড়া করে নিয়ে যায়। গলির ভেতর ধাওয়া দেয় ট্যাঙ্ক। মাথার ওপর ড্রোন।

গাজায় কোনো কোনো শিশুকে দেখা যায়, কবরস্থানে একা ঘুরছে। ফিলিস্তিনি অনেক শিশুকে দেখা যায় বাহুতে ‘ট্যাগ’ সেঁটে ঘুরছে তারা। তাতে মারা গেলে তাদেরকে চেনা যায়। একের পর এক শিশুকে হত্যা করেও অনুশোচনা নেই ইসরাইলের। কোনো দুঃখ প্রকাশও করা হয় না।

এ বিষয়ে একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করেছে ‘মিডলইস্ট আই’। সুমাইয়া ঘানুশির লেখা ওই আর্টিক্যালটি শুরু করা হয় আবেগঘন ভাষা দিয়ে। তিনি লিখেন, ‘ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে শিশুরা। এই শিশুরাই কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে অন্য শিশুদের। ছোট ছোট হাত জড়িয়ে রেখেছে ছোট ভাই-বোনদের। এভাবেই এরা আগলে রেখেছে পরিবারের যারা বেঁচে আছে, তাদেরকে।’

অবৈধ এই দেশটি ফিলিস্তিনী শিশুদের আগামী দিনের হুমকি হিসেবে দেখে

ইসরাইলি সাংবাদিক অরলি নয় বলেন, ‘এখন মিডিয়াগুলোও মেনে নিয়েছে গাজায় কোনো নিরপরাধ নেই।’

দুর্ঘটনাবশত ইসরাইল শিশুদের হত্যা করছে না। বরং শিশু হত্যাই এদের কৌশল। গাজায় শিশুদের বোমা মেরে হত্যা করা হয়। এছাড়া বোমা না মেরেও হত্যা করা হয়। ওখানকার শিশুরা ক্ষুধায় কাতর থাকে। রোগে সংক্রমিত হয়। ঠিকমতো চিকিৎসা পায় না।

ল্যানসেটের এক নিবন্ধে জানানো হয়, গাজায় প্রতি ২২০ জনের জন্য একটি টয়লেট এবং প্রতি ৪,৫০০ জনের জন্য একটি করে ঝরনা ছিল। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার সংক্রমণ হয়।

বোমা ও ক্ষুধা থেকে যারা বেঁচে থাকে তারা প্রায়ই অঙ্গ হারায়। প্রতিদিন প্রায় ১০ শিশু অঙ্গচ্ছেদের শিকার হয়। অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই অন্ধকার ঘরে, সার্জনরা টর্চের আলোয় তাদের মাংস কেটে ফেলে দেন।

গাজার হাসপাতালগুলোতে অনেক আহত শিশুর পরিবারে কোনো সদস্য নেই। ধ্বংসস্তূপ থেকে তুলে আনা, পুড়ে যাওয়া এই শিশুরা এতিম। এদের নাম বলার মতো কেউ বেঁচে নেই।

প্রতি বছর, ৫০০ থেকে ৭০০ ফিলিস্তিনি শিশুকে ইসরাইলি সামরিক আদালতে গ্রেপ্তার করা হয়। পাথর ছোঁড়ার অভিযোগে এদের বিচার করে কারাগারে পাঠানো হয়। অনেককে রাতে তাদের বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়, চোখ বেঁধে গাড়িতে তোলা হয়। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের নামে মারধর। পরে হিব্রু ভাষায় লেখা স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। গাজার শিশুরা হিব্রু ভাষা বুঝে না।

আগেই বলা হয়েছে, ‘শিশুহত্যা’ ওখানে দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিতভাবেই এই ঘৃণ্য কাজটি করছে ইসরাইল। অবৈধ এই দেশটি ফিলিস্তিনী শিশুদের আগামী দিনের হুমকি হিসেবে দেখে। তাছাড়া এই শিশুরাই পাথর হাতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। একা বুক টান করে দাঁড়ায় ট্যাঙ্কের সামনে।

দীর্ঘদিন থেকে শিশুদের হত্যা করার নীতি প্রয়োগ করে আসছে ইসরাইল। ইহুদিবাদী রাজনীতিবিদ এবং রাব্বিদের অনেকে ফিলিস্তিনি শিশুদের শত্রু হিসেবে উল্লেখ করে। বিনা দ্বিধায় তাদের হত্যা করার আহ্বান জানিয়েছেন এক রাব্বি। গাজায় জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশু ‘ইতোমধ্যেই একজন সন্ত্রাসী’, বলে উল্লেখ করেছিলেন নেসেটের এক সদস্য। বাইবেল থেকে আমালেকদের কাহিনীর কথা উল্লেখ করে শিশু হত্যার বৈধতা খুঁজেন নেতানিয়াহু। তিনি একে ‘ঐশ্বরিক কর্তব্য’ হিসেবেও উপস্থাপন করেছেন। এ কারণে শিশুদের হত্যা করে ফিলিস্তিনের আগামী মুছে ফেলতে চাইছে ইসরাইল।

তবে ফিলিস্তিনী শিশুরা জীবনকে ভালোবাসে- প্রচণ্ডভাবে, বিদ্রোহীভাবে। ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে, ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে, তাদের নিভিয়ে দেওয়ার প্রতিটি চেষ্টার পরও তারা জীবনকে আঁকড়ে থাকে। তারা ধরে রাখে গ্রামের নাম, গাছের গল্প। বন্ধ করে দেওয়া দরজার চাবি থাকে তাদের হাতে। এসব কারণেই শিশুদেরকে সবচাইতে বড় হুমকি মনে করে ইসরাইল। কারণ যতদিন শিশুরা থাকবে, ততদিন এই গল্প চলতেই থাকবে। যতদিন শিশুরা থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবে ফিলিস্তিন।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...