
উত্তর আমেরিকার মাঠে বসেছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। বিশ্বমঞ্চে ট্রফি জয়ের লড়াইয়ে দলগুলো যখন ব্যস্ত, তখন ফুটবলপ্রেমীদের আলাদাভাবে নজর কেড়েছে ফ্রান্স দল। মাঠের পারফরম্যান্সে ফরাসিরা যতটা দুর্দান্ত, মাঠের বাইরের এক হিসেবে তারা ততটাই বৈচিত্র্যময়।
পরিসংখ্যান বলছে, এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ২৬ সদস্যের মূল স্কোয়াডের ২১ জনই (৮১%) কোনো না কোনোভাবে অভিবাসী বা দ্বৈত নাগরিকত্বের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে থেকে শুরু করে ওসমানে দেম্বেলে—ফরাসি ফুটবলের বর্তমান সফলতম এই প্রজন্মের নাড়ির টান আদতে লুকিয়ে আছে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কিংবা ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে।
ফ্রান্স ফুটবল দল কেবল একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে না, এটি যেন হয়ে উঠেছে বিশ্ব অভিবাসনের এক অনন্য উদাহরণ। বর্তমান স্কোয়াডের দিকে তাকালে দেখা যায়, দলটির মূল শক্তির সিংহভাগই আফ্রিকান বংশোদ্ভূত।
এছাড়াও স্কোয়াডে থাকা জুল কুন্দে (বেনিন), দায়ো উপামেকানো (গিনি-বিসাউ), অরিলিয়েন চুয়ামেনি (ক্যামেরুন), এবং ব্র্যাডলি বারকোলা (টোগো) ফরাসি ফুটবলকে দিয়েছেন এক বহুমাত্রিক রূপ।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, ফ্রান্সের দলে এত বেশি অভিবাসী ফুটবলার আসার রহস্য কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ফ্রান্সের বিশেষ করে প্যারিস, লিওঁ বা মার্সেই শহরের শহরতলী বা অবহেলিত এলাকাগুলোতে।
এই জনবহুল এবং প্রধানত অভিবাসী-অধ্যুষিত এলাকাগুলোর কলোনি ফুটবল মাঠগুলোই এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিভার খনি। এখানকার কঠিন জীবনযুদ্ধ থেকে উঠে আসা তরুণদের কাছে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি জীবন বদলানোর হাতিয়ার। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে এই একাডেমিগুলোর প্রতিভা চিনে নিয়ে তাদের বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ সুবিধা দেয়, যার ফল আজ হাতেনাতে পাচ্ছে ফ্রান্স।
মজার ব্যাপার হলো, ফ্রান্সের এই অভিবাসী ফুটবল সংস্কৃতির প্রভাব শুধু ফরাসি দলেই সীমাবদ্ধ নয়। ফরাসি ফুটবল একাডেমিগুলোর গভীরতা এতই বেশি যে, ফ্রান্সে জন্ম নিয়ে এবং বড় হয়েও প্রায় ১০০ জন ফুটবলার এবারের বিশ্বকাপে খেলছেন।
তবে তাদের মধ্যে মাত্র ২৩ জন খেলছেন ফ্রান্সের হয়ে। বাকিরা মাঠ মাতাচ্ছেন মরক্কো, আলজেরিয়া, সেনেগাল কিংবা আইভরি কোস্টের মতো তাদের পূর্বপুরুষদের দেশের জার্সিতে। অর্থাৎ, পরোক্ষভাবে পুরো বিশ্বকাপের চালিকাশক্তিই যেন নিয়ন্ত্রণ করছে ফরাসি ফুটবল একাডেমিগুলো।
১৯৯৮ সালে যখন ফ্রান্স প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে, তখন সেই দলকে বলা হতো এক সম্মিলিত শক্তি। জিনেদিন জিদানের সেই ঐতিহ্যের পর আধুনিক ফুটবলে এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের এই দল প্রমাণ করেছে যে, জাতীয়তাবাদ কেবল জন্মসূত্রে নয়, এক সুতোয় বেঁধে গোলপোস্টে বল জড়ানোর যৌথ স্বপ্নের মধ্যেও থাকে।
২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স যদি তাদের চেনা ছন্দ ধরে রেখে আরও একবার বিশ্বজয় করতে পারে, তবে তা হবে বহু সংস্কৃতির, বহু শিকড়ের এবং বৈচিত্র্যের এক মহাকাব্যিক বিজয়।