শহীদের রক্তে অমর বসন্ত: বেহেশতি জাহরায় বিজয়ের গান

জীবনবিদেশ1 hour ago6 Views

ইহুদিবাদী ইসরাইল ও আমেরিকার যৌথ হামলার শিকার হওয়া মানুষদের রক্তে রঞ্জিত এ মাটি। তেহরানের শহীদদের শেষ ঠাঁই হচ্ছে ইরানের রাজধানী তেহরানের বিশাল কবরস্থান বেহেশতি জাহরা। অনেকে এই কবরস্থানকে ভালোবেসে ডাকেন ‘শহীদদের শহর’। বেহেশতি জাহরা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা

এই শহরের ঠিক মাঝখানে এক বিশেষ জায়গা আছে, যার নাম, গোলজার-এ শহীদ বা শহীদদের বাগান। সেখানকার একটি দিনের খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরছি। রমজানের যুদ্ধের দামামা বাজছে। এর মাঝেই তেহরানের বেহেশতি জাহরা কবরস্থানের ৪২ নম্বর প্লট যেন এক অন্য জগত। বাইরে হাড়কাঁপানো শীত। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত— তিল ধারণের জায়গা নেই নাদবে নামাজঘর এবং আশপাশে। সব পার্কিং গাড়িতে ঠাসা। বাতাসে শুধু বিষণ্ণতার সুর।

চারপাশে কালো পোশাক পরা মানুষের ভিড়। সবার চোখ লাউডস্পিকারের দিকে। কখন প্রিয়জনের নাম ডাকা হবে? কখন শুরু হবে শেষ বিদায়ের মিছিল? এই ভিড়ে মিশে থাকা মুখগুলো চেনা। ঠিক যেন কয়েক দিন আগে দেখা সেই ১২ দিনের যুদ্ধ কিংবা জানুয়ারি বিদ্রোহের শহীদদের স্বজনদের প্রতিচ্ছবি।

এবারের শহীদদের গল্পটা একটু আলাদা, আবার চিরচেনা। তারা কোনো সামরিক উর্দিতে ছিলেন না। হাতে ছিল না কোনো মারণাস্ত্র। তারা ছিলেন সাধারণ মানুষ— নারী, শিশু আর টগবগে তরুণ। তাদের একমাত্র অপরাধ ছিল, তারা ইরানে নিজেদের স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছিলেন। ইহুদিবাদী ইসরাইল আর আমেরিকার ফেলা বোমার আঘাতে মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে তাদের স্বপ্ন।

ভিড়ের মধ্যে একজনকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। চেনা মুখ। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “এখানে কেন?” জানলাম, তার ভাইয়ের ১৯ বছরের ছেলে মেহেদি আজবগোল আর নেই। তেহরানের পূর্ব দিকের একটি ভবনে বন্ধুদের সঙ্গে থাকাকালীন হানা দেয় ঘাতক ড্রোন। ইসরাইল ও পশ্চিমা শক্তির নির্মম হামলায় শহীদ হয় মেহেদি।

আজবগোল পরিবারের জন্য শাহাদাত নতুন কিছু নয়। এই পরিবারের প্রথম শহীদ ছিলেন দাউদ আজবগোল। দাউদও ছিলেন ঠিক ১৯ বছরের এক তরুণ। আইআরজিসির গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করতেন তিনি। বছরের পর বছর আগে জানজান প্রদেশে এক দুর্ধর্ষ অভিযানে গিয়ে শত্রু আর দাউদ মুখোমুখি হয়ে যায়। শক্রুকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন দাউদ। শত্রুর গুলি লেগেছিল দাউদের বুকে, আর দাউদের গুলি বিঁধেছিল শত্রুর মগজে।

আজ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইতিহাসের সেই একই ট্র্যাজেডি ফিরে এল। মেহেদি আজবগোল, যে কি না মসজিদের আঙিনায় বেড়ে ওঠা এক মেধাবী ছাত্র ছিল, সেও তার পূর্বসূরির মতো ১৯ বছর বয়সেই চলে গেল।

মেহেদির মা যখন কথা বলছিলেন, তার চোখে ছিল এক অপার্থিব স্থিরতা। এত অল্প বয়সে ‘শহীদের মা’ পরিচয়টা যেন তাঁর কাঁধে বড় বেশি ভারী মনে হয়। মায়াভরা ধরা গলায় বললেন, “আমার ছেলেটা মসজিদের ছাত্র ছিল, পড়াশোনায় ছিল তুখোড়। শেষমেশ ও মুক্তি পেল।”

বাবা শোনালেন আরও এক বুকফাটা বীরত্বের গল্প। শহীদ হওয়ার ঠিক দশ মিনিট আগে মেহেদি ফোন করেছিল তাকে। আকুতিভরা গলায় বলেছিল, “বাবা, আমার জন্য দোয়া করো। আমিও যেন শহীদ হতে পারি।”

ছেলের সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। মেহেদির এই শেষ ফোন কি আমাদের বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের সেই কিশোর শহীদ আনাসের কথা মনে করিয়ে দেয় না? যে কি না ৩৬ জুলাইয়ের বিজয়ের প্রাক্কালে লিখে গিয়েছিল, মা, যদি ফিরে না আসি, তবে মনে করো তোমার ছেলেটা দেশের জন্য শহীদ হয়েছে।” তেহরানের মেহেদি আর ঢাকার আনাস যেন একই আদর্শের দুই পিঠ। দুজনেরই বয়সের কোঠায় কৈশোরের ছাপ, কিন্তু চেতনার দিক থেকে তারা হিমালয় সমান অটল।

বেহেশতি জাহরার ৪২ নম্বর প্লটে এখন মেহেদির নিথর দেহ চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে আছে। তার এই অকাল প্রস্থান আর ঝরে পড়া তাজা রক্ত ইতিহাসে সাক্ষী হয়ে থাকবে— নির্দোষ মানুষের ওপর চালানো বিশ্বব্যাপী অবিচারের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...