প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার: মানবিক ভাষায় অমানবিক বয়ান

আলাপ হচ্ছে ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’ নিয়ে। শরিফ ওসমান হাদি শহীদ হওয়ার পর এই আলাপ নতুন করে উঠে এসেছে। প্রভাবশালী এই দু’টি পত্রিকা অফিসে আগুন দেওয়া হয়েছে।

কারা আগুন দিয়েছে?

এ নিয়ে চলছে তর্ক। কেউ সরাসরি দায়ী করে দিচ্ছেন বিপ্লবীদের। কেউ বলছেন এই আগুনের জন্য দায়ী প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার নিজেরাই।

আসলে এই দায় কার?

বলছি সে কথা। ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টারের’ আসল শক্তি কোথায় সে বিষয়েও আসবো।

যারা মনে করেন, এই দুটি পত্রিকা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর, মানুষ হত্যার পক্ষে ক্রমাগত বয়ান উৎপাদন করে যাচ্ছে, তারা ঠিক কোন পদ্ধতিতে এই আগ্রাসন মোকাবেলা করবেন, সে প্রসঙ্গেও আলাপ হবে।

আসা যাক, এই আগুন দেওয়ার পেছনে কারা দায়ী, সেই বিষয়ে।

কোনোরকম ঘুরচাপ না করে বললে বলতে হয়- এর পেছনে দায়ী সরকার।

কীভাবে?

ড. ইউনূস বা তার উপদেষ্টারা কি ওখানে গিয়ে আগুন দিয়ে এসেছেন?

না। উপদেষ্টারা যাননি, কিন্তু তারা এই পত্রিকাদু’টির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলেছেন। আর এর সুযোগ নিয়ে কোনো একটা পক্ষ কাজটা সেরে ফেলেছে।

পাঁচ আগস্টের পর এই মিডিয়া গ্রুপের কোমল আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্তরা যেসব অভিযোগ তুলেছিলেন, সেগুলো আমলে নেয়নি সরকার।

শেখ হাসিনার সময় কীভাবে বয়ান উৎপাদন করেছে প্রথম আলো, সে বিষয়ে বিষদ জানিয়েছেন মুফতি হারুন ইজহারসহ অনেকেই। ‘জঙ্গি’ ট্যাগ দিয়ে কারাগারে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিলো যাদেরকে, তাদের অনেকে ফিরে এসে ভয়াবহ অভিযোগ তুলেছেন প্রভাবশালী পত্রিকাদু’টির বিরুদ্ধে। কোনোরকম ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার তাদের নামের সাথে কীভাবে জঙ্গি তকমা জুড়ে দিয়েছে, সেসব তথ্যও দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা গণমাধ্যম সংস্কারের কথা বলেছেন। সরকারের কাছে ন্যায়সঙ্গত আচরণ চেয়েছেন। কিন্তু তখন দেখা গেছে, সরকারের লোকজন ‘প্রথম আলো’কে তাদের ‘প্রিয় পত্রিকা’ উল্লেখ করে ভুক্তভোগীদের তাচ্ছিল্য করেছেন।

সরকারে থাকা বিপ্লবীদের অনেকেও ওই সময় প্রথম আলোর সঙ্গে গলাগলি করেছেন।

এতে ক্ষুব্ধদের ক্ষোভ আরো বেড়েছে। তারা সরকারের ব্যাপারে নিরাশ হয়েছে। অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সরকার এই আগ্রাসন মোকাবেলায় কিছু করবে না। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের নিজেদেরকেই দাঁড়াতে হবে।

কিন্তু তারা এটা জানেন না, কোমল আগ্রাসন মোকাবেলা করতে হয় কোমলতা দিয়ে। আগুন দিয়ে নয়। ওই সময়ের ভুক্তভোগীরা আগুন দেননি।

কিন্তু তারা মজলুম। আর মজলুমের বেদনায় সাধারণেরা ক্ষুব্ধ হবেন, এটাই স্বাভাবিক।

পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য কোনো একটা পক্ষ যদি কোনো মওকা পেয়ে যায়, তখন সাত-পাঁচ না ভেবে এর সঙ্গে ক্ষুব্ধ সাধারণদের জড়িয়ে যাওয়াটাও স্বাভাবিক।

আমার ধারণা, এখানেও এমন কিছু ঘটেছে।

তবে এই আগুন দেওয়ার দায় যে সরকারের, সেটা আমার ধারণা নয়। বরং এটাই সত্যি।

কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, এই সত্যটা এখনো বুঝতে পারছে না সরকার।

সরকারের ভেতরে কি এমন লোকেরা বসত করছেন, যারা চাচ্ছেন বিষয়টা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ আরো বাড়ুক?

নাহয় এখনো আপনাদের ‘প্রিয় পত্রিকা’র বিষয়টাকে সিরিয়াসলি হ্যান্ডেল করছেন না কেন? গণমাধ্যম সংস্কারে একটা ব্যবস্থা নিন। আর কোমল নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ আমলে নিন। ঠিকঠাকভাবে তদন্ত করুন। তাহলেই তো ঝামেলার অনেকটা মিটে যায়।

সত্যি কথা বলতে কি, প্রথম আলো আমারও ‘প্রিয়’ পত্রিকা।

কেউ ভুল বুঝবেন না। পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতি আর বয়ান তৈরি করে মানুষকে হত্যাযোগ্য করে তোলার পক্ষে আমি না। কিন্তু এই পত্রিকাটি পড়তে ভালো লাগে আমার।

কেবল আমার নয়, আরো অনেকের। পড়তে যদি ভালোই না লাগতো, তাহলে প্রথম আলো বিপননে প্রথম কেন?

এতো সমালোচনার পরও প্রথম আলো কেন সবচাইতে বেশি বিক্রি হয়?

এই বিষয়টা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন না অনেকে।

আপনারা খোঁজার চেষ্টা করছেন না, প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের আসল শক্তি কোথায়?

আমার সঙ্গে আলাপে যারা আছেন, তারা কী বলতে পারবেন? এদের শক্তির উৎস কী?

হ্যাঁ, সহজভাবে অনেকেই বলে দেবেন, শক্তির উৎস ভারত।

ওকে, মেনে নিলাম। তাহলে আপনারা এই পত্রিকাটিকে বয়কট করলেই তো কাজ হয়ে যায়। অফিস পোড়ানোর দরকার কী?

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ভারত-বিরোধী। আর সবাই মিলে ভারতের একটা প্রোডাক্টের দিকে ফিরে না তাকালেই হয়।

বাস্তবতা হলো, এই পত্রিকাটিই বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি পাঠকপ্রিয়। ভারত-বিরোধী অনেকেও এটি পড়তে পছন্দ করেন।

এই পছন্দটা কেন করেন, সেটা কি ভেবে দেখেছেন?

মূল সমস্যাটা এখানেই। আর এখানেই লুকিয়ে আছে প্রথম আলোর আসল শক্তি।

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মূল শক্তি হলো পরিপাটি ভাষা ও শক্ত স্টাইলশিট। এই দুইটা শক্তি মানুষকে মুগ্ধ করে। সেইসাথে এদের আছে বুদ্ধিবৃত্তিক ভান করার ক্ষমতা। মানবিক শব্দ ব্যবহার করে অমানবিক বয়ান তৈরি করে পত্রিকা দু’টি।

এই ক্ষমতা অন্য কোনো পত্রিকার নেই। একারণেই ওই পত্রিকাগুলোর সমৃদ্ধ সংবাদও অনেকসময় স্লোগানের মতো পরিবেশন হয়। অন্যদিকে প্রথম আলোর গুজামিলের সংবাদের পরিবেশন হয় সমৃদ্ধ অলঙ্কার দিয়ে সাজিয়ে। আর এই অলঙ্কারগুলোই মানুষকে মুগ্ধ করে। এবং এই মুগ্ধতা পাঠককে টানে।

যারা ন্যায়ের পক্ষে আছেন, তাদেরকে সবার আগে এই সত্যটা স্বীকার করে নিতে হবে।

তারপর আসবে আগ্রাসন মোকাবেলায় মাঠে নামার প্রশ্ন।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলার সবচাইতে কার্যকর উপায় হলো ভালো বয়ান তৈরি করা।

এই সত্যটা অনেকে জানেন। কিন্তু মানতে গিয়ে তারা ‘কপি প্রথম আলো’ তৈরি করতে চান।

আরে ভাই, প্রথম আলো তো নিজের মতো করে নিজের পথটা তৈরি করে নিয়েছে। আপনি যদি তাকে ফলো করতে চান, আপনাকে সবসময় পেছনেই থাকতে হবে। ফলোয়াররা সাবজেক্টকে পেছনে ফেলতে পারে না। বড়জোর সাবজেক্টকে পেছন থেকে ধাক্কা দিতে পারে। এই ধাক্কায় সাবজেক্টের কিছুই ক্ষতি হয় না। বরং ফলোয়ার ভেঙে চুড়মার হয়।

আপনাকে পথ তৈরি করতে হবে আপনার মতো করে, প্রথম আলোর মতো করে নয়।

আপনি সত্যের পক্ষে কাজ করতে চাইলে, আপনার ভাষা হতে হবে মানবিক। তবে নৈতিক অবস্থান থাকবে স্পষ্ট ও কঠিন। তাহলেই কেবল আপনি অন্যের ‘ভিক্টিম ব্ল্যামিং’ বা ‘ডিহিউম্যানাইজেশন’ ভাঙতে পারবেন।

আপনাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে, তাদের বয়ানটা কেন ভুল ও ক্ষতিকর। কিন্তু দেখাতে গিয়ে মাথা গরম করলে চলবে না।

তাদেরকে কেবল খারাপ বললেই হবে না, বরং কেন খারাপ সেটা সংযত, তবে শক্ত থেকে বলে দিতে হবে।

ন্যায়ের পক্ষে থাকা অনেকেই ভাষার এলোমেলো ব্যবহার করেন। এতে পিছিয়ে পড়েন তারা। অনেকে ন্যায়সঙ্গত যুক্তি থাকার পরও সেটা ডেলিভারি দিতে পারেন না। বরং গালি দিয়ে বসেন।

অনেকে আবার সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টকেই সব মনে করে বসে থাকেন। তারা বুঝেন না, এর জন্য দরকার বিষদ গবেষণা। আবার যারা গবেষণা করেন, তারাও সেই গবেষণাটুকু ঠিকঠাকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন না। তাদের থাকে ভাষাগত দুর্বলতা।

দুর্বলতা দিয়ে মিথ্যাকে ঘায়েল করা কঠিন। এতে মিথ্যার পক্ষের লোকেরা আপনার দুর্বলতা নিয়ে হাস্যরস তৈরি করার মওকা পায়।

আপনি যদি ঠিকঠাকভাবে স্টাইলশিট তৈরি করতে পারেন। ভালো সম্পাদনা করেন। ভলো শিরোনাম দিতে পারেন। তথ্যসূত্র ঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানেন, তাহলে আপনার ভাষাও হবে সুখপাঠ্য, মার্জিত ও দৃঢ়।

আপনিই পারবেন ‘মানুষকে হত্যাযোগ্য’ করে তোলার বয়ানের মুখোশ খুলে দিতে।

আপনি মানুষকে শেখাতে পারবেন, প্রোপাগান্ডা কীভাবে কাজ করে।

দেখিয়ে দিতে পারবেন, শব্দ দিয়ে কীভাবে বাস্তবতা পাল্টে দিচ্ছে ওরা।

এই বিষয় নিয়ে আপনারা পাঠচক্র করতে পারেন। অনলাইনে সুশৃঙ্খল আলোচনা করতে পারেন। মনে রাখবেন, সচেতন পাঠক বড় একটি প্রতিরোধ।

প্রতিরোধ করতে গিয়ে ওদের মতো করে মিথ্যা ছড়ানো যাবে না। আপনি সত্যের পক্ষে লড়াই করছেন, এর মানেই মিথ্যার বিরুদ্ধে আপনার অবস্থান।

আপনার বিপরীত মতের মানুষকেও ঘৃণার বস্তু বানাতে যাবেন না। বিপরীত পক্ষের মানবিক অধিকার স্বীকার করতে হবে।

ওরা যখন আপনার কাছে নৈতিক উচ্চা হারিয়ে ফেলবে, তখন বয়ান যুদ্ধেও হেরে যাবে।

আর আপনি যদি এলোপাতাড়ি তরবারি চালান, তাহলে মিথ্যা বয়ান আরো ভয়ঙ্কর হয়ে চেপে বসবে।

আলাপ: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

প্রযোজনা: সজল ফকির

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...