একটু অবাক মনে হলেও বিষয়টা সত্য, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে জামায়াত নয়, এনসিপির প্রচার চালাচ্ছেন। তার ফেসবুক পোস্টে দেখা যাচ্ছে শাপলাকলির জয়ধ্বনি। শুধু এটাই না, জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের একরকম উলঙ্গ সমালোচনাও করছেন তিনি। নিজামীর এই ছেলের নাম মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান। তিনি ডা. শফিকসহ বর্তমান নেতৃত্বকে সুবিধাবাদী বলে মনে করেন। আধুনিক জামায়াতের অনেক সিদ্ধান্তর সমালোচনাও করেন।
নাদিম মাওলানা নিজামীর ছোট ছেলে। তার বড়ভাই ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন পাবনা-১ আসন থেকে জামায়াতের মনোনয়ন পেয়েছেন। আর নাদিম থাকেন তুরস্কে।
মাওলানা নিজামীর চার ছেলে এবং দুই মেয়ে। সন্তানদের মধ্যে সবচাইতে বড় মোহসিনা ফাতেমা। তার স্বামী সাইফুল্লাহ মানসুর। তিনি সংবাদপাঠক, ইসলামী গানের শিল্পী।
নিজামীর বড় ছেলে ড. নাকিবুর রহমান। দ্বিতীয় ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। তৃতীয় ছেলে ডা. নাইমুর রহমান খালেদ। ছোট ছেলে নাদিমুর রহমান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এনসিপির পক্ষে কাজ করছেন তিনি।
নভেম্বরের ১০ তারিখ ফেসবুকে শাপলাকলি পোস্ট করে নাদিম লিখেন, ‘শাপলা কলি পাড়ায় পাড়ায়, দেশ গড়বে সকলে মিলে……’
বুধবার প্রকাশ করা এক পোস্টে হিন্দু ও দলের বাইরে থেকে জামায়াতের নমিনেশন দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টি উল্লেখ করে দলের নাম থেকে ‘ইসলাম’ শব্দটি বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নাদিম।
তিনি মনে করেন, জামায়াতের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ হলো তার বাবাসহ শীর্ষ নেতাদের শাহাদাত। তারা ফসল ফলিয়ে গেছেন। আর বর্তমান নেতা-কর্মীরা সেগুলো ঘরে তুলছে আর ভোগ করছে।
নাদিমের টাইমলাইন ঘাঁটলে পরিষ্কার হয়ে যায়, তিনি ডা. শফিকুর রহমানের ঘোর বিরোধী। তিনি মনে করেন, এটিএম আজহার মুক্তি পাওয়ার পর ডা. শফিকের উচিত ছিলো দলের পদ থেকে সরে দাঁড়ানো। মকবুল আহমেদ সাহেবের পর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ছিলেন আমীরে জামায়াত হওয়ার সবচাইতে যোগ্য ব্যক্তি।
খোমেনি ইহসানের পোস্ট শেয়ার করে এই মন্তব্যগুলো করেছেন তিনি।
ওই পোস্টে খোমেনি ইহসান ডা. শফিককে ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে ভয়ঙ্কর প্রতারক বলে উল্লেখ করেছেন। তাকে মুনাফিক ও ফাসিকও বলেছেন। তিনি দলের ভেতরে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমির হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন খোমেনি।
পোস্টের নিচে একজন হযরত আবুবকর রা. এর ছেলের উদাহরণ টেনে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, হযরত আবুবকর রা. এর ছেলে আব্দুল্লাহ হযরত উসমান রা. কে হত্যা করতে গিয়েছিলেন। উসমান রা. তাকে দেখে বললেন, তোমার বাবা বেঁচে থাকলে এই কাজটা পছন্দ করতেন না। একথা শুনে লজ্জা পেয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ।
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বেঁচে থাকলে, তার ছেলের এই কাজগুলো পছন্দ করতেন না বলে উল্লেখ করেন ওই মন্তব্যকারী।
নাদিমের পোস্টে জামায়াত-সমর্থক অনেককেই সমালোচনা করতে দেখা গেছে। কেউ তাকে পরামর্শ দিয়েছেন, দলে ফিরে আসার জন্য। কেউ তুলনা করছেন নুহ (আ) এর ছেলে কেনানের সঙ্গে। নাদিমকে মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর ছেলে ফারুক মওদুদীর সঙ্গেও মেলাচ্ছেন অনেকে। ফারুক মওদুদী বরাবরই জামায়াতের সমালোচনা করে আসছেন। মাওলানা মওদুদীর সন্তান হয়েও তার আদর্শের বিরোধীতা করায় সেক্যুলারদের কাছে তার কদর আছে। ২০১৩ সালে তাকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন শাহরিয়ার কবিররা। ওই সময় তার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিলো প্রথম আলো।
মাওলানা মওদুদী তার লাইব্রেরি ও বইগুলোর স্বত্ত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন জামায়াতকে। তার মৃত্যুর পর ফারুক মওদুদী ‘তাফহীমুল কুরআন’ এর স্বত্ব দাবি করেন। বিষয়টা মামলা পর্যন্ত গড়ায়। মামলায় হারেন ফারুক। এরপর থেকে জামায়াত বিদ্বেষ প্রকট হয়ে উঠে তার। বাংলাদেশে তাকে পাকিস্তানী ইসলামিক স্কলার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
ফারুক মওদুদী বা কেনানের সঙ্গে মাওলানা নিজামীর ছেলে নাদিমকে তুলনা করা অযৌক্তিক বলে মনে করেন তিনি। কারণ কেনান ছিলো কাফের, আর ফারুক মওদুদী ছিলেন শাহরিয়ার কবিরদের মতো সেক্যুলার। কিন্তু তিনি কাফের নন। অথচ জামায়াতের অনেকে অপবাদ দিয়ে তাকে একরকম কাফের বানিয়ে দিতে চাচ্ছেন।
ফেসবুকে পিন করা একটা পোস্টে এসব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন তিনি। এতে নাদিম উল্লেখ করেন, শীর্ষ নেতাদের মুক্তির আন্দোলন কৌশলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি জামায়াত। তবে ওই আন্দোলনে যদি তিনিও শহিদ হতেন, তাহলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতেন।
তার অভিযোগ, জামায়াতের অনেকে তাকে পাগল বলে অপবাদ দেয়। তিনি পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখেন না বলেও প্রচার চালায়। তবে মাঝেমধ্যেই মায়ের সাথে তার কথা হয় বলে উল্লেখ করেন নাদিম। এমনকি তার মা কিছুদিন তুরস্কে গিয়ে তার বাসায় থেকেও এসেছেন। সেখান থেকে জামায়াতের মিটিংও করেছেন বলে জানিয়েছেন নাদিম।
এই স্ট্যাটাসে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, পরিবারের সাথে তার অতোটা দূরত্ব নেই। তবে দূরত্ব যে আছে, সেটা তো ঠিক।
একভাই দাঁড়িপাল্লা নিয়ে মাঠে নেমেছেন পাবনা-১ আসনে। অন্যভাই প্রচার করছেন শাপলাকলির।
পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে, দুইভাই দুই মার্কা নিয়ে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
কে কোন দল করবেন, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। বাবা জামায়াতের আমির ছিলেন বলে ছেলেকেও জামায়াত করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। জামায়াতে যেমন আমিরের ছেলেকেই আমির বানানো হয় না, তেমনি আমিরের ছেলে অন্য দলেও যেতে পারেন, সেটা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু কেন তিনি দাঁড়িপাল্লা ছেড়ে শাপলাকলির প্রচার করছেন, সেটা নিয়ে মানুষের কৌতুহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
একজন মানুষ হিসেবে সেই কৌতুহল আমারও তৈরি হয়েছে। কিন্তু কৌতুহলের জবাব দেবে কে?
নাদিমুর রহমান নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি করা বিষয়গুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে ডা. শফিকুর রহমান আর জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব ভয়ঙ্কর। এরা সিন্ডিকেট করছেন। যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজকের ভালো দিন পেয়েছেন, তাদের উত্তরসুরী এবং পুরনো জামায়াত নেতাদের কনুই মারছেন।
আর যদি সেটা সত্যি নাহয়, তাহলে সমস্যাটা নাদিমুর রহমানের। কারণ তার বাবা ও তাদের সময়ের নেতাদের ত্যাগের মূল্যায়ন না হলে পরিবারের অন্যরাও কথা বলতেন, এটা স্বাভাবিক।
হ্যাঁ, এক্ষেত্রে মনে হতে পারে, বড়ভাই নাজিব দাঁড়িপাল্লার টিকেট পেয়েছেন, তাই তিনি দলের সাফাই গাইছেন। আর আশার বাতি জ্বেলে রেখে প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন ছোটভাই নাদিম।
আর যদি সেটাও সত্যি নাহয়, তাহলে?
তাহলে আমাদের চলে যেতে হবে সমাজতত্ত্ব, পারিবারিক মনস্তত্বের মতো কঠিন বিষয়ে।
বিষয়গুলো একটু কঠিন হলেও আমি সহজ করে বলছি-
অনেক সময় রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া সন্তানেরা নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় পরিবারের সবাই এক রাজনৈতিক ধারায় আছে। একজনের মনে হতে পারে নিজেকে একটু আলাদা করে দেখানোর। আর এই আলাদা করে দেখাতে গিয়ে পুরোপুরিই আলাদা হয়ে যায় তারা।
আলাদা সাজার পেছনে সবসময় যুক্তি থাকে না, থাকে আলাদা হওয়ার তাগিদ।
অনেকে বিদ্রোহী টাইপের হন। পরিবারের রোল-মডেলের সাথে বিদ্রোহ করতে চান। সেটা হোক ভালো কিম্বা মন্দ।
অনেক সময় পরিবারে প্রতিযোগিতা থেকেও এমন হয়। পরিবারে কোনো সন্তানকে আলাদা কদর করা হলে অন্য সন্তান ভেতর থেকে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে থাকে। তখন পরিবারের পরিচয়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে আলাদা করে ফোকাসে আসার চেষ্টা করেন তারা। সমালোচনার মাধ্যমে আলোচনায় আসতে চান।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, তখনো তারা আলাদা হতে পারেন না। ওই পরিবারের সন্তান হিসেবেই আলোচনা হয় তাকে নিয়ে।
এতে তার মনে হয়, তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। সুতরাং এই গুরুত্ব টিকিয়ে রাখতেই সমালোচনা চালিয়ে যেতে হয়।
আবার রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও সবাই যে রাজনৈতিক শিক্ষা ঠিকভাবে নিতে পারেন, সেটাও না। কেউ কেউ আদর্শিক কাঠামোর ভুল ব্যাখা করেন।
আর কিছু লোকের তো এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট মানসিকতাই থাকে। খারাপ সময়ে সারভাইভ করা এই লোকেরা ভালো সময়কে ধারণ করতেই জানেন না। এরা সমালোচনা করতেই পছন্দ করেন। আর এই সমালোচনাগুলোর ঢাল হিসেবে তুলে ধরেন ইউটোপিয় বা অলিক ধারণা।
দল বা পরিবারে নিজের অবস্থান কমে যাওয়া, অথবা আগের সুবিধা হারানোর প্রতিক্রিয়া ঘুরে-ফিরে নানাভাবে জানান তারা।
পরিচিত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রত্যাশা থাকে বেশি। ছোটবেলা থেকে পারিবারিক পরিচয়ের কারণে গুরুত্ব পেয়ে আসেন তারা। হঠাৎ সেই গুরুত্ব কমে গেলে নিজের মতো করে গুরুত্ব বাড়াতে চান তারা।
নাদিমুর রহমানের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেছে, সেটা আমি বলছি না। আমি কেবল কিছু সত্য আলাপ করে গেলাম।
আলাপ: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
প্রযোজনা: সজল ফকির