তারেক রহমান এসেছেন, বাংলাদেশ কি আধিপত্যবাদ মুক্ত হবে?

দেশে ফেরার পর সমবেত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের দরজা খুলে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তাঁকে হত্যার পর অনিশ্চিত দিকে যাত্রা করে গণতন্ত্র। পরে গণতন্ত্রের জন্য স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া। আর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে ছিলেন তারেক রহমান।
তারেক রহমানকে নিয়ে লিখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এমাজউদ্দীন আহমদ। এতে তারেককে তিনি বিনয়ী, সদাশয় ও মৃদুভাষী হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি লিখেন, ‘তারেক রহমানকে আমি দেখি একজন শিক্ষকের দৃষ্টি দিয়ে।’
এমাজউদ্দীন আহমদ লিখেন, ‘তাকে চিনি দীর্ঘদিন ধরে। কোনো আলোচনা সভা বা সেমিনারে নয় বরং ঘরোয়া পরিবেশে। সুশীল তরুণ হিসেবে। তার বক্তব্য ঋজু। চিন্তা-ভাবনা সুস্পষ্ট। কৃত্রিমতা এখনো তাকে স্পর্শ করেনি। স্পর্শ করেনি দুর্বুদ্ধিপ্রসূত কোনো জটিলতা।’
তারেক রহমানের যখন জন্ম, তখন জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরের বিশ তারিখ তারেকের জন্ম হয়েছিলো ঢাকায়। তাকে ডাকা হতো পিনু বলে। পিনুর ছোটভাই কোকোর জন্ম হয়েছিলো ১৯৭০ সালে।
তারেকের পড়ালেখা শুরু হয় বিএএফ শাহীন কলেজে। এরপর সেন্ট জোসেফ কলেজ এবং ঢাকা রেসিডেনসিয়াল কলেজে পড়েন তিনি। ওখান থেকে মাধ্যমিক ও আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন। ১৯৮৪ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। পরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন।
পড়া শেষ করে গার্মেন্টস খাতে বিনিয়োগ করেন তিনি। খুব কম সময়ের মধ্যেই সফল হন। পরে নৌ-যোগাযোগ খাতেও বিনিয়োগ করেন তারেক।
বাবা এবং পরে মায়ের সুবাদে ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন তিনি। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম লেখান বাংলাদেশ বিএনপির বগুড়া কমিটির সদস্য হিসেবে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারে মায়ের সাথে সারা দেশ চষে বেড়ান তারেক। ২০০১ এর নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন। ওই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে জয় পায় চারদলীয় জোট। ২০০২ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সাথে ব্যাপক গণসংযোগ শুরু করেন। আয়োজন করেন তৃণমূল সম্মেলনের। এতে আলাদা করে গুরুত্ব পায় বিএনপিকে নিয়ে তরুণদের আবেগ। তৃণমূল সম্মেলনের মাধ্যমে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধানমন্ত্রীর সন্তানের পরিচিত থেকে বেরিয়ে এসে তারেক রহমান পরিচিতি পান দক্ষ সংগঠক হিসেবে। এতে শঙ্কা তৈরি হয় আওয়ামী শিবিরে। তখন থেকেই তারেকের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে লেগে যায় আওয়ামী লীগসহ ভারতের প্রতি নতজানু গোষ্ঠি। তার বিরুদ্ধে চলতে থাকে নানা প্রপাগান্ডা। দলীয় প্রধানের রাজনৈতিক কার্যালয় ‘হাওয়া ভবন’কে নিয়ে সাজানো হয় কল্পিত গল্প। এগুলো প্রকাশ করা হয় ভারতের আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার অংশীদার কয়েকটি গণমাধ্যমে। যে কোনো ব্যবসা থেকে লাভের ‘টেন পার্সেন্ট’ তারেক রহমানকে দিতে হতো বলে, প্রপাগান্ডা চালায় ওই গণমাধ্যমগুলো।
পরে আসে ওয়ান ইলাভেন পরিস্থিতি। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রোষানলে পরে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ওইসময় আওয়ামী লীগের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার প্লট তৈরি করা হয়েছিলো বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হওয়ার প্রথম দুই মাসে দেড়শো’ জনের বেশি রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীকে আটক করা হয় দুর্নীতির অভিযোগে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে যেতে হয় কারাগারে। এর দুইমাস পার হওয়ার আগেই দুর্নীতির মামলায় ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় তারেক রহমানকে। তিনি তখন দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব। তার বিরুদ্ধে দেওয়া হয় আরো ১৩ দুর্নীতি মামলা।
গ্রেপ্তারের কিছুদিন পর আদালতে হাজির করা হয় তারেক রহমানকে। তার উপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে আদালতে অভিযোগ করেন তার আইনজীবিরা। পরে চিকিৎসকদের একটি দল পরীক্ষা করে এই অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পরিবর্তে শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়া হয়।
টানা ৫৫৪ দিন কারাগারে থাকার পর ১২টি মামলায় জামিন পান তারেক রহমান। তখন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাসপাতালে ভর্তি। নির্যাতনের মুখে মেরুদন্ড ভেঙে যাওয়ায় হাসপাতালের বিছানা থেকে উঠতে পারছিলেন না তিনি।
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টম্বর, বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সন্তানকে দেখতে হাসপাতালে যান খালেদা জিয়া। ওই রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন তারেক রহমান।
২০১৩ সালের মে মাসে ঢাকার একটি আদালত তারেক রহমানকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। তবে তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকায় শেখ হাসিনা সরকারের নানামুখী চেষ্টার পরও তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
এর আগে এই নেতাকে জড়ানো হয়েছিলো ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের এক জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হয় এবং তখনকার বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হয়।
২২ আগস্ট মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক ফারুক আহমেদ বাদি হয়ে মামলা করেন। তখনো তারেক রহমানকে এ মামলায় আসামি করা হয়নি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলার পুনঃতদন্ত শুরু হয়। তখন নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং তখনকার বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর নাম আসে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পুনরায় অধিকতর তদন্তন্তের নামে তারেক রহমানসহ বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের নাম জুড়ে দেওয়া হয়।
২০১১ সালে সম্পূরক চার্জশিটে তারেক রহমানকে প্রধান ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার আসামি করা হয়।
২০১২ সালে বিচার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রæত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করে। এতে তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত।
তারেক রহমানকে জড়ানো হয় দশট্রাক অস্ত্র মামলার সঙ্গে। ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তারেক রহমানসত কয়েকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
এই রায়গুলোকে প্রহসন হিসেবে নিন্দা করা হয় বিভিন্ন মহল থেকে। মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির ইশারায় তারেক রহমানকে টার্গেট করা হয়েছিলো বলে মনে করেন তারা।
ওয়ান ইলাভেন সরকারের দুই বছর এবং শেখ হাসিনা সরকারের পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে তারেক রহমানকে ফাঁসানোর সূত্র খোঁজা হয়। জরুরি অবস্থার সময় দফায় দফায় সংশোধন করা হয় দ্রæত বিচার আইন। পরে সাজানো মামলায় ফরমায়েশি রায়ে দন্ড দেওয়া হয় তাকে। এর আগে তারেক রহমানকে অন্যায়ভাবে সাজা দিতে রাজি না হওয়ায় এক বিচারককে চলে যেতে হয় অন্য দেশে।
২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। ওই বছরই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান তারেক রহমান। লন্ডন থেকেই দলের নেতৃত্ব দিতে থাকেন তিনি। তবে বাংলাদেশ থেকে তার বিরুদ্ধে তৈরি করা হয় নানা প্রতিবন্ধকতা। দেশিয় গণমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে। কিন্তু তার আওয়াজ রুখে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারেক রহমানের ডাক পৌঁছে যায় সাধারণের কাছে। তরুণ এই নেতার ডাকে মানুষ উজ্জীবিত হতে থাকে। সংগঠিত হয় দল।
ধারবাহিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসে ২০২৪ সাল। তারপর আসে আগস্ট মাসের পাঁচ তারিখ। ওইদিন ছাত্র ও জনতার অভূতপূর্ব বিপ্লবের মুখে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। মুক্ত ঘোষণা করা হয় খালেদা জিয়াকে।
তার বিরুদ্ধে করা একটি কার্টুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আনন্দ উদযাপন করেন তারেক রহমান। কার্টুনটি করেছিলেন মেহেদি হক। এতে বুঝানো হয়েছিলো, ক্ষমতার লোভে ভার্চুয়াল দুনিয়া ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে চলে আসছেন তারেক রহমান।
কার্টুনটি শেয়ার করে তারেক রহমান লিখেন, ‘আমি গভীরভাবে আনন্দিত যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হয়েছে।’
তিনি লিখেন, ‘২০০৬ সালের আগে, বাংলাদেশি কার্টুনিস্ট, বিশেষ করে শিশির ভট্টাচার্য, প্রায়ই আমার মা এবং আমাকে নিয়ে কার্টুন আঁকতেন। যাই হোক, গত ১৫ বছরে, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে জোরপূর্বক গুমের শিকার হতে দেখেছি, তার কাজের জন্য অকল্পনীয় নির্যাতন এবং কারাবরণ সহ্য করতে হয়েছে।’
আরও অনেকে একই ধরনের নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন উল্লেখ করে তারেক লিখেন, ‘শিশির ভট্টাচার্য কার্টুন আঁকা বন্ধ করে দেন। আমি কার্টুনিস্ট মেহেদীর ভক্ত, শিশির ভট্টাচার্যের কাজও উপভোগ করতাম। আন্তরিকভাবে আশা করি, তিনি দ্রুত ও নিয়মিত রাজনৈতিক কার্টুন আঁকবেন।’
আজ তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। তবে দেশ থেকে এখনো আধিপত্যবাদী শক্তি পুরোপুরি বিদায় হয়নি।
আশা করা হচ্ছে তারেক রহমান নেতৃত্ব দেবেন, বাংলাদেশের। তিনি সতর্ক থাকবেন আধিপত্যবাদ থেকে।

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...