গোস্তাকি মাফ করবেন সেনাপতি

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

রহিম-রূপবান আর তাজেলের আদি গল্পে এই গানটা নেই। লোককথা নানাভাবে ছড়ায়। কখনো চরিত্র বদলে যায়। কোথাও দেখা যায় তাজেল চরিত্রটি নারী, কোথাও আবার পুরুষ। কখনো রুপবানের সাহসি স্বামী তাজেল। কখনো দুর্বল চিত্ত্বের। খুব কম বয়সে রূপবানের বিয়ে হয় রহিমের সাথে। বড় হওয়ার পর সে রাজকুমার তাজেলের প্রেমে পড়ে। কোনো কাহিনীতে দেখা যায় রহিম তাজেলের ভৃত্য। আর রূপবান হলো তাজেলের বউ।

রূপবান গরিব ঘর থেকে এসেছে, এ কারণে তাজেলের মা তাকে অপছন্দ করে। তার বিশ্বাস, রূপবানের কারণে সংসারে অমঙ্গল হচ্ছে। মায়ের প্ররোচনায় রূপবানকে বনবাসে পাঠিয়ে দেয় তাজেল। বনের ভেতর ফেলে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয় ভৃত্য রহিমকে। তারপর এগিয়ে যেতে থাকে রহিম-রূপবানের গল্প।

এই গল্পে তাজেল রূপবানকে ভালোবাসে। তবে মায়ের চাপে রূপবানকে বনবাসে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয় সে। এখানে তাজেল কাপুরুষের ভূমিকায়।

কিন্তু আমাদের বাস্তব তাজেল, কাপুরুষ নন। লোককথার তাজেলের মতো রূপবানকে বনবাসে পাঠিয়ে দিয়ে রাজা-উজির নিয়ে ব্যস্ত নন তিনি। বরং সাহসি এই নায়ক এখনো টিকে আছেন, তার প্রতিশ্রুতির ওপর। তিনি রূপবানকে যেমন আশ্বাস দিয়েছেন, সেটাই করে দেখাতে চাচ্ছেন। রূপবানকে দেওয়া কথা রাখতে গিয়ে ফন্দিবাজ উজির, পরিষদ আর সেনাপতির চোখরাঙানিকেও উপেক্ষা করছেন।

বাস্তব গল্পে রূপবানেরা হলো, রাজ্যের সব প্রজা। আর এই প্রজাদের ছিলো এক ঘাতকরানি। তিনি প্রজাদেরকে কচুকাটা করতে শুরু করেছিলেন। এতে রাজ্যজুড়ে লেগে যায় ধুন্দুমার বিদ্রোহ। কোনো এক আগস্ট মাসের পাঁচ তারিখে রানি একটা ঈগল পাখির পিঠে চড়ে পালিয়ে যান প্রতিবেশি দুশীলদেশে। ওই দুশীলদেশ থেকে ঘাতকরানিকে স্বরাজ্যে মানুষ হত্যার অনুপ্রেরণা দেওয়া হতো।

ঘাতকরানি পালিয়ে যাওয়ার পর, আশায় বুক বাঁধলো রূপবানেরা। রাজ্যে নতুন রাজা এলো। রানিকে যারা তাড়িয়েছেন, তাদের অনেকে নিতে শুরু করলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ফাঁক-ফেঁকড় দিয়ে নানা দায়িত্বে ঢুকে গেলো মতলববাজেরাও। সঙ্গদোষে নষ্ট হতে শুরু করলো আসল বিদ্রোহী বা বিপ্লবীদের অনেকে। দেখা গেলো, রাজ্যের উজির-নাজিরদের অনেকে রূপবানদের বেমালুম ভুলেই গেছে!

রূপবানেরা ভেবে নিলো, এবার তাদের আর রক্ষা নাই। বনবাসে যেতেই হবে। তারপরও একটা আশা টিকিয়ে রাখলো নতুন মহারাজের ওপর। রূপবানেরা তাকিয়ে থাকলো ওদিকে। কিন্তু দেখা গেলো, তার সভাসদদের অনেকে দুশীলদেশের সাথে আঁতাত করছেন। দুশীলদেশের সেনাপতির সঙ্গে কথা বলছেন এই রাজ্য বা দেশের সেনাপতি। আবার সভাসদদের ভেতরে ও বাইরে অনেকে সেনাপতির সাফাই গাইছেন।

অবশ্য প্রশংসা পাওয়ার যোগ্যতা সেনাপতি রাখেন। পালিয়ে যাওয়া ঘাতকরানি কিন্তু এই সেনাপতির পরিজন ছিলেন। তারপরও পাঁচ তারিখ রানির আদেশ শুনেননি তিনি। ঘাতকরানি আদেশ দিয়েছিলেন প্রাসাদমুখী সব প্রজাদেরকে মেরে ফেলার। সেনাপতি এই জঘন্য আদেশ পালন করেননি। তিনি নরম মনের মানুষ। তিনি বরং রানিকে ফুসলিয়ে ঈগলের পিঠে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ঈগল গিয়ে ঘাতকরানিকে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলো দুশীলদেশে।

পরে কী হলো?
পরে রূপবানদের রাজ্যে নতুন রাজা এলো। বিনাযুদ্ধে রাজার বশ্যতা স্বীকার করে নিলেন সেনাপতি। এতে রাজ্যের প্রজারা খুশি হলো। তারা সেনাপতির নামে জয়ধ্বনি দিলো। কিন্তু সব রাজ্যেই কিছু দুর্মুখ থাকে। এই রাজ্যেও আছে। তারা প্রশ্ন তুললো- ঘাতকরানির জন্য তো ঈগল পাখির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সেনাপতি নিজেই। তিনি কেন তাকে দুশীলদেশে যেতে দিলেন? কেবল তার পরিজন হয় বলে? নাকি এর আড়ালে অন্যকিছু লুকিয়ে আছে?

ওই দুর্মুখদের বিরুদ্ধে আমি তখন যুক্তি দাঁড় করেছিলাম- রানি যতবড় ঘাতকই হোক না কেন, তাকে মেরে প্রজারা কেন ঘাতক হতে যাবে?

আগস্টের পাঁচ তারিখ, ঘাতকরানির প্রাসাদের দিকে ধেয়ে যাচ্ছিলো প্রজাদের স্রোত । রানির পোষা ঈগলগুলো আকাশে উড়াল দিয়েছিলো। উড়তে উড়তে খালি করে দিচ্ছিলো মায়ের কোল। ঘরের বারান্দায় থাকা শিশুরাও রক্তাক্ত হয়ে ঢলে পড়ে যাচ্ছিলো। পোষা দানবগুলো ছড়িয়ে গিয়েছিলো সড়কে সড়কে। দানবেরা কোথায় আছে, কোনদিকে যায় ঠাহর করা যাচ্ছিলো না। একটার পর একটা মানুষের খুলি উড়ে যাচ্ছিলো। সে ছিলো এক নৃশংস রণক্ষেত্র। একপক্ষে দানবের দল, অন্যপক্ষে নিরস্ত্র প্রজারা।

হাতে অস্ত্র না থাকলেও, প্রজাদের চোখে তখন জমে গিয়েছিলো রক্ত। অকুতোভয় এই রক্তলাল চোখগুলো কেবল খুঁজে বেড়াচ্ছিলো ঘাতকরানিকে।
ওইদিন প্রাসাদের ভেতর ঢুকে গিয়েছিলো প্রজারা। তার আগেই পালিয়ে গিয়েছিলেন ঘাতকরানি।

তিনি যদি পালিয়ে না যেতেন, তাহলে?
দৃশ্যটা একবার ভাবুন।

দুর্মুখদেরকে আমি বলেছিলাম- রানিকে দুশীলদেশে পাঠিয়ে দিয়ে বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন সেনাপতি। নাহলে তার চোখ-কান হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতো না।

কিন্তু দুর্মুখেরা পাল্টা যুক্তি দাঁড় করিয়ে বললো- তাকে তো ফৌজি-শিবিরেই আটকে রাখা যেতো!

সেটা যেতো। কিন্তু ওই সময় হয়তো এই বুদ্ধি আসেনি সেনাপতির মাথায়। আর ঘাতকরানি রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায়, তাৎক্ষণিকভাবে খুশিই হয়েছিলো প্রজারা।

রানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যখন ঘন হয়ে এসেছিলো, তখন প্রজারা স্লোগান তুলেছিলো- এই মুহূর্তে দরকার, ফৌজি সরকার। অর্থাৎ এই ঘাতককে বিদায় করতে পারলেই বেঁচে যায় প্রজারা। এরপর যেই আসুক, আপত্তি নেই তাদের।

আসলে একজন ঘাতকের চকচকে তরবারি যদি আপনার ঘাড়ে ধরে রাখা হয়, তখন একজন ডাকাতকেও উদ্ধারকারী হিসেবে পেতে দ্বিধা থাকবে না আপনার। অথচ আপনি জানেন, এই ঘাতকের তরবারি থেকে উদ্ধার করার পর, ডাকাত আপনার বাড়ি লুট করে নিয়ে যাবে।

বাড়ি লুট হওয়ার বিনিময়ে হলেও আপনি আপন প্রাণ বাঁচাতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক।

না, সেনাপতিকে তখন ডাকাত বলে মনে হয়নি আমার। এখনো মনে হচ্ছে না। তবে কিছুটা তো সন্দেহ করতেই পারি- ঘাতকরানির আঁচলের সাথে কি তার মন বাঁধা পড়ে আছে?

সেনাপতি, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি অকৃতজ্ঞ বান্দা নই। ঘাতকরানির পরিজন হয়েও পাঁচ তারিখ আপনি রাজ্যের জন্য যা করেছেন, সেই কৃতজ্ঞতা অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছি। আপনার আচার-আচরণেও আমি বিমুগ্ধ। কিন্তু…

কিন্তু গোস্তাকি মাফ করবেন, সেনাপতি। আপনি কি বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন- শুরু থেকেই আপনি আমাদের নতুন মহারাজের অনুগত আছেন? নাকি বুকে পাথর বেঁধে এখনো তার পতনের অপেক্ষায় রয়েছেন? শান দিয়ে যাচ্ছেন পালিয়ে যাওয়া রানির ফেলে যাওয়া তরবারিতে?

আপনি কেন দুশীলদেশের মদদে হওয়া ফৌজিবিদ্রোহ তদন্তকে ‘খামোশ’ বলে থামিয়ে দিতে চেয়েছিলেন? অবশ্য এই তদন্ত ইতোমধ্যে থেমে গেছে কি না, সে খবর আমার কাছে নেই।

সেনাপতি, অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা ফৌজদারদের অনেককে পাঁচ তারিখের পর ফৌজে ফিরিয়ে আনেননি কেন?
কেন গুম-খুনের সাথে সম্পৃক্তজনদেরকে আপনার খিদমত থেকে বহিষ্কার করেননি?

আপনি কি কোনোকিছুর আশায় প্রহর গুনছিলেন? ভবিষ্যতে কাজে লাগানোর জন্য তুলে রেখেছিলেন তাদের?

অবশ্য মহারাজের এক উজির জানিয়েছেন- আপনার সাথে অনেকবার কথা বলে তার কখনো মনেই হয়নি, আপনি ক্ষমতা দখলের লোভ করছেন। তিনি জানিয়েছেন, আপনি রাজ্যের স্থিতিশীলতার ব্যাপারে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকেন। আপনি চান- দ্রুত একটা পটপরিবর্তন হয়ে যাক, এতে রাজা ও প্রজারা স্থিতিশীল হয়ে যাবে।

কিন্তু রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে গেছে ভিন্নকথা- গুম ও খুনের তদন্ত এগিয়ে গেলে আপনারও নাকি ফেঁসে যাওয়ার শঙ্কা আছে? এ কারণেই আপনি নাকি মহারাজের প্রধান কাজির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন? সাক্ষাত করেছেন স্বয়ং মহারাজের সঙ্গেও? কোনো কোনো রাজনৈতিক দল থেকেও কিছু একটার আশ্বাস চেয়েছিলেন?

গোস্তকি মাফ করবেন, সেনাপতি। রাজ্যজুড়ে যেসব ঢোল বাজছে, সেগুলোই আপনাকে শুনিয়ে যাচ্ছে এই অধম বান্দা। প্রজারা বলছে, আপনি নাকি তাজেলকেও দলে টানার চেষ্টা করেছিলেন?

আমাদের এই তাজেল, রূপবানের তাজেলের মতো কাপুরুষ নন। তিনি কারো প্ররোচনায় পড়ে রূপবানদের বনবাসে পাঠিয়ে দিতে রাজি হননি।

আমাদের তাজেল, বয়সে কম। তবে সাহসে পাহাড়ের মতো বিশাল। সেনাপতির শানদার তরবারিতে তার ভয় নেই। ফন্দিবাজ উজিরদেরকেও তিনি তুচ্ছ করেন। মহারাজ তাকে রাজ্যপক্ষের উকিল নিযুক্ত করেছেন। সেই ক্ষমতাই ব্যবহার করছেন তাজেল। বাঘের মতো হুঙ্কার দিয়েছেন- রাজ্যে এমন সাহস কার, যে রূপবানদের বনবাসে পাঠাতে চায়?

এই হুঙ্কারের পর সারা রাজ্যে খুশির ঢাক-ঢোল বাজা শুরু হয়ে গেছে। প্রজারা ‘তাজেল- তাজেল’ বলে জয়ধ্বনি দিচ্ছে।

আর আপনি, সেনাপতি? আপনি অনবরত মানুষের সন্দেহকেই বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

আমি বলছি না, আপনি কোনো কূট-চাল চালছেন।

সেনাপতি, আপনার যদি সত্যিই রাজা-উজির খেলার ইচ্ছা না থাকে, তাহলে ঝেড়ে কাশুন। আপনার গুনাহগার ফৌজদারদেরকে তুলে দিন তাজেলের হাতে। ইতোমধ্যে যদি তুলে দিয়ে থাকেন, ভালো করেছেন। মনের ভেতরে কোনো বদ-নিয়ত উঁকি দিলেও প্রশ্রয় দেবেন না। মহারাজের পাশে এসে দাঁড়ান। দয়ালু রাজাকে সব প্রজারাই ভালোবাসে। আপনিও ভালোবাসা পাবেন।

গোস্তাকি মাফ করবেন, সেনাপতি!

আর হ্যাঁ, তাজেলকেও দুইটা কথা বলা দরকার- রূপবানের প্রেমে পড়েছেন, ভালোকথা। এগিয়ে যান, প্রজারা আছে আপনার সাথে। কিন্তু মনে রাখবেন, চলতিপথে ঝোপে-ঝাড়ে ফাঁদ পাতা থাকে। একবার ফাঁদে পড়বেন, তো মরবেন। সুতরাং, কারো মন না জেনে প্রেমে মজা যাবে না!

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...