খালেদা জিয়াকে সংকুচিত করবেন না

বিশ্লেষণ1 month ago26 Views

খালেদা জিয়ার মালিকানা কার?
জিয়া পরিবারের? বিএনপির? বাংলাদেশের? নাকি সারা বিশ্বের?
আসলে তিনি সবার। কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের জন্য তিনি সম্পদ।
বিশ্ব খালেদা জিয়াকে সেভাবেই গ্রহণ করেছে। বিশ্ব নেতাদের কাছে তিনি একজন আপসহীন নেত্রী। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারা বিশ্ব সেভাবেই সাড়া দিয়েছে। বিশ্ব ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে।
তবে এখানে একটা কথা আছে, আমরা যদি খালেদা জিয়াকে কেবল বাংলাদেশের গণ্ডির ভেতর আটকে রাখতে চাই, তাহলে?
তাহলে অন্য দেশের লোকেরা তাঁকে ধারণ করার সুযোগ পাবে কোথায়?
আর বিএনপির লোকেরা যদি তাঁকে কেবল বিএনপির নেত্রী হিসেবে আটকে রাখতে চান, তাহলে অন্য দলগুলোকেও ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
আসলে সুযোগ দেওয়া হোক বা নাহোক, খালেদা জিয়া গোটা বিশ্বের অ্যাসেট, এটাই সত্য।
রাজনৈতিক দলগুলোর সতর্ক থাকতে হবে, এই সত্যটা যেন কোনো কারণে ধূসর না হয়ে যায়।
এ ক্ষেত্রে বিএনপির দায় বেশি। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন, এটি সত্য। কিন্তু কেবল এই সত্যটাকে তুলে ধরা হলে চাপা পড়ে যায় আরো বড় সত্য: খালেদা জিয়া কেবল বিএনপির নেত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। বিশ্বরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ফিগার। তাঁকে দলীয় সীমার ভেতরে আটকে ফেলার চেষ্টা মানে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপ্তি ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সংকুচিত করা।
সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠার যে দীর্ঘ সংগ্রাম- তা কোনো একক দলের সম্পত্তি হতে পারে না। এই সংগ্রাম ছিল রাষ্ট্রের, ছিল জনগণের, ছিল সময়ের।

রাজনীতিবিদ্যায় নেতা দুইরকম- একটি দলীয় নেতা। অন্যটি রাষ্ট্রনায়ক বা জাতীয় ব্যক্তিত্ব। দলীয় নেতা দলের আদর্শ, সংগঠন ও ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করেন। আর রাষ্ট্রনায়ক প্রতিনিধিত্ব করেন রাষ্ট্রের ইতিহাস, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতির সমষ্টিগত স্বার্থের।
খালেদা জিয়া দলের সীমা পেরিয়ে রাষ্ট্রের সীমাও পেরিয়ে গেছেন। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কেবল বিএনপির ক্ষমতায় থাকার ইতিহাসের অংশ নন; তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার উজ্জ্বল অংশ। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল কোনো দলীয় কর্মসূচির চাইতেও বড়। সেটা ছিল সংবিধানিক শাসন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই। এই লড়াই কোনো দলের একচেটিয়া বিষয় হতে পারে না।
তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। সোচ্চার ছিলেন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। শেষ জীবনে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দীর্ঘসময় নির্যাতন সয়েও দেশের মাটি আঁকড়ে থাকার মধ্য দিয়ে বিশ্বদরবারে হয়ে উঠেছেন সংগ্রামের প্রতীক।
সমাজবিজ্ঞানী মরিস হালবাখস এই বিষয়টিকে বলেছেন ‘কালেকটিভ মেমোরি’ বা সমষ্টিগত স্মৃতি। কিছু মানুষ ব্যক্তিগত বা দলীয় স্মৃতির গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতির স্মৃতিতে স্থায়ী আসন করে নেন। আর জাতির স্মৃতিতে স্থায়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ব-স্মৃতিতেও আসন পোক্ত হয়। খালেদা জিয়া সেই জায়গায় পৌঁছেছেন।
আর এমন উঁচু মাপের নেতাদেরকে দলীয় মালিকানায় রাখা যায় না। ইতিহাস তাঁদেরকে নিজের করে নেয়।
নেলসন ম্যান্ডেলা কেবল দক্ষিণ আফ্রিকা বা তার দল ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ এর নন। ঠিক তেমনি খালেদা জিয়াও কেবল বিএনপির নন।
এই সত্যটা বিএনপির অনেকে হয়তো বুঝতে পারছেন না। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে খালেদা জিয়ার মালিকানা দিতে তাদের অনীহা দেখা যাচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানে এই বিষয়টিকে বলা হয় ‘ওভার-আইডেন্টিফিকেশন’। এ ক্ষেত্রে অনুসারীরা নেতার সঙ্গে নিজেদের পরিচয় গুলিয়ে ফেলেন। তখন নেতা আর মানুষ থাকেন না, হয়ে ওঠেন আবেগের প্রতিমা।
এর ফল হয় ভয়াবহ।
নেতাকে ‘আমাদের’ বলে দাবি করতে গিয়ে অন্যদের জন্য তিনি হয়ে ওঠেন ‘ওদের’।
নেতার সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ মনে করে অনুসারীরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন।
এই অতিরিক্ত রক্ষণশীলতাই শেষ পর্যন্ত নেতার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইতিহাসে বহু মহান মানুষ তাঁদের কাজের জন্য নয়, তাঁদের অনুসারীদের আচরণের কারণে বিতর্কিত হয়েছেন। এটি নেতার নয়, অনুসারীদের ব্যর্থতা।
রাজনৈতিক তত্ত্বে একে বলা যায় ‘সিম্বল ক্যাপচার’। যখন কোনো গোষ্ঠী একটি সর্বজনীন প্রতীককে নিজেদের একচ্ছত্র সম্পদ হিসেবে দাবি করে, তখন প্রতীকের সার্বজনীনতা নষ্ট হয়। মানুষ ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। যে নেতা সবার ছিলেন, তিনি হয়ে ওঠেন বিভাজনের কেন্দ্র।
খালেদা জিয়াকে কেবল বিএনপির সম্পদ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা এই বিপদের দিকেই নিয়ে যাবে। এতে তাঁর ঐতিহাসিক উচ্চতা বাড়বে না, বরং কমবে।

বিএনপি নেতাকর্মীরা মন দিয়ে শুনুন
খালেদা জিয়ার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানাতে চাইলে কিছু বিষয় গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে আপনাদের।
প্রথমত, আপনাদের ভাষা ঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। ‘বিএনপির নেত্রী’ নয়, তাঁকে বলতে হবে- ‘গণতন্ত্রের নেত্রী’ ‘আপসহীন নেত্রী’ ‘আধিপত্যবাদবিরোধী নেত্রী’। তিনি বাংলাদেশের নেত্রী।
দ্বিতীয়ত, তাঁর নাম ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোকে আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। অবিসংবাদিত মহান কোনো নেতাকে মৃত্যুর পর রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো তাঁর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।
তৃতীয়ত, সমালোচনার জায়গা খোলা রাখতে হবে। ইতিহাসে যাঁরা বড়, তাঁদের নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। প্রশ্নকে ভয় পেলে ইতিহাস ছোট হয়ে যায়।
চতুর্থত, তাঁর উত্তরাধিকার দল নয়, জাতির হাতে ছেড়ে দিতে হবে। তিনি থাকবেন পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে।
খালেদা জিয়াকে সীমাবদ্ধ করা মানে তাঁকে ছোট করা। তাঁকে ‘কেবল বিএনপির’ বলা মানে তাঁর জীবনের অর্জনকে সংকুচিত করা। তিনি বিএনপির নেত্রী ছিলেন, কিন্তু কেবল বিএনপির ছিলেন না। তিনি ছিলেন সময়ের, ইতিহাসের, বাংলাদেশের।
তাঁকে তাঁর প্রাপ্য জায়গায় থাকতে দিন-
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের উচ্চতম স্তরে,
যেখানে দল নয়, রাষ্ট্রই শেষ পরিচয়।

আলাপ: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

প্রযোজনা: সজল ফকির

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...