
শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
নতুন বাংলাদেশের পেছনে ছিলো সংগ্রামের ইতিহাস। আর এই সংগ্রামের পেছনে ছিলো আপোষ না করা নেত্রীর আখ্যান।
তিনি খালেদা জিয়া, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী।
শেষবার খালেদা জিয়ার ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর বাংলাদেশে জেঁকে বসে ওয়ান ইলাভেন সরকারের ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসে নতজানু আওয়ামী লীগ সরকার। বাংলাদেশকে পনেরো বছরেরও বেশি সময় চেপে রাখে ফ্যাসিবাদ।
ফ্যাসিবাদের পুরোটা সময় সোচ্চার ছিলো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। আর বিরোধীদের মাঝে তারা হয়ে জ্বলেছিলেন খালেদা জিয়া।
আপোষহীন সেই নেত্রীকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। ততদিনে ভেঙে গেছে তার শরীর।
তবে এর আগে বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছেন ধারাবাহিক সংগ্রামের উদাহরণ।
সেই ঊনিশশো একাশি সাল থেকে শুরু হয়েছিলো খালেদা জিয়ার সংগ্রাম। ওই বছর ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়। এরপর দুই সন্তান নিয়ে অনেকটা দিশেহারা অবস্থায় ছিলেন খালেদা। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত। দলের হাল ধরবেন কে, সেটা নিয়েও ছিলো বিতর্ক। শেষে খালেদা জিয়াতেই কেটে যায় ক্রান্তির সময়।
ঘরের বউ থেকে তিনি হয়ে উঠেন রাজনীতিবিদ। তারপর খালেদা জিয়া হয়ে উঠেন সংগ্রামের প্রতীক।
অথচ ছোটবেলায় তিনি ছিলেন পুতুলের মতো। তাঁর আদুরে নাম ছিলো পুতুল।
১৯৪৫ সালে পুতুলের জন্ম হয় জলপাইগুড়িতে। ওই এলাকাটা তখন ছিলো অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার আওতায়। তার বাবা ইস্কান্দার আলী মজুমদার ছিলেন চা ব্যবসায়ী। মা তৈয়বা মজুমদার। পুতুলের বাবার বাড়ি ফেনীর ফুলগাজিতে। ইস্কান্দার মজুমদারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে পুতুল তৃতীয়। পুতুলের ভালো নাম ‘খালেদা খানম’।
১৯৬০ সাল, পুতুলের বয়স তখন পনেরো, তার বিয়ে হয়ে যায় কমলের সঙ্গে। কমলের ভালো নাম জিয়াউর রহমান। বিয়ের সময় তাঁর বয়স ছিলো চব্বিশ। বিয়ের পর স্বামীর নাম যোগ করে ‘খালেদা খানম’ হয়ে গেলেন ‘খালেদা জিয়া’।
জিয়াউর রহমান তখন ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। এ কারণে ১৯৬৫ সালে খালেদাকেও চলে যেতে হয়েছিলো পশ্চিম পাকিস্তানে। তবে ১৯৬৭ সালে প্রথম সন্তান তারেক রহমানের জন্ম হয়েছিলো ঢাকায়। দ্বিতীয় সন্তান আরাফাত রহমানের জন্ম ১৯৭০ সালে। এর একবছর আগেই জিয়া-খালেদা দম্পতি ফিরে এসেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে। সেনাবাহিনীতে পদায়নের কারণে তারা চট্টগ্রামে বসবাস করতে থাকলেন।
১৯৭১ সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কিছুদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় চলে যান তিনি। বড় বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় থাকেন ১৭ জুন পর্যন্ত। পরে জুলাই মাসের দুই তারিখ এস আব্দুল্লাহর বাসা থেকে পাক সেনারা দুই ছেলেসহ বন্দি করে খালেদা জিয়াকে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান।
১৯৮১ সালের মে মাসের ত্রিশ তারিখে হত্যা করা হয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে। ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির সদস্য হন খালেদা জিয়া। একই বছর সাত নভেম্বর জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে প্রথম বক্তব্য রাখেন তিনি।
‘সময়-অসময়’ শিরোনামে একটি বইয়ে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘বিএনপিতে যোগ দেবার পর থেকে খালেদা জিয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া শুরু করেন।’
১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসের আট তারিখ সংবাদপত্রে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি শোষণহীন, দুর্নীতিমুক্ত, আত্মনির্ভরশীল দেশ গঠনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেছিলেন।’
খালেদা জিয়া উল্লেখ করেন, ‘বিগত কিছুকাল যাবৎ আমি বিএনপির কার্যক্রম গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি। দলের ঐক্য ও সংহতি বিপন্ন হতে পারে, এমন মনে করে আমাকে দলের দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। তাই দলের বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপিতে যোগ দিয়েছি ও দলের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হয়েছি। দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং শহীদ জিয়ার গড়া দলে ঐক্য ও সংহতির স্বার্থে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া আমার লক্ষ্য।’
মহিউদ্দিন আহমদ তার বইয়ে লিখেন, ‘১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার এবং প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের সাথে খালেদা জিয়াও উপস্থিত ছিলেন।’
উনিশশো বিরাশি সালের জানুয়ারি মাসের একুশ তারিখ বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়। উনিশশো তিরাশি সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হন এবং এপ্রিল মাসের প্রথমে বিএনপির এক বর্ধিত সভায় ভাষণ দেন। এর কয়েকমাস পরই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন।
১৯৮২ সালের মার্চ মাসে তখনকার সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিএনপি সভাপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় একনায়কতন্ত্র।
এরশাদের নেতৃত্বে ১৯৮২ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। প্রথম দিন থেকেই সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন খালেদা জিয়া। তার সক্রিয় নেতৃত্বে, বিএনপি ১২ আগস্ট ১৯৮৩ সালে ছয়টি দলের সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। প্রথম সপ্তাহে সতদলীয় জোট গঠন করে।
১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রথম বড় জনসভার নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। ২৮ নভেম্বর জোট নেতাদের সাথে ঢাকায় সচিবালয় ঘেরাও আন্দোলনে অংশ নেন। এরপর গৃহবন্দী করা হয় তাঁকে।
এর মধ্যে বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ্য হয়ে যান। ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি মাসের তিন তারিখ বিএনপি প্রধান থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। পরে একটি কাউন্সিলে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এরপর এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন আরো জোড়ালো হয়ে উঠে। ১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৮৬ সালে নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন এরশাদ। বিএনপির নেতৃত্বে সাতদলীয় জোট এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পনেরোদলীয় জোট নির্বাচনের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করে। বৃহত্তর নির্বাচনী জোট গঠনে অস্বীকৃতি জানায় আওয়ামী লীগ।
১৯৮৬ সালের ১৯ মার্চ এক জনসভায় শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন, এরশাদের অধীনে যারা নির্বাচনে যোগ দেবে তারা হবে জাতীয় বেঈমান। পরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয়। অন্যদিকে খালেদা জিয়া আপোষহীনভাবে নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করেন। তখন থেকেই তাঁর ‘আপোষহীন’ ভাবমূর্তি তৈরি হয়।
নির্বাচনের পর মুক্তি পান খালেদা জিয়া। পরে এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামাতে নতুন আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৮৭ সালের ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের সাথে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন। খালেদা জিয়া তখন সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিতে রাজপথে ছিলেন। তিনি ঢাকায় একটি গণসমাবেশের ডাক দেন। সমাবেশ থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সাতদলীয় জোটের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক হরতাল হয়। অক্টোবরের বাইশ তারিখ খালেদা জিয়ার বিএনপি শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় ১০ নভেম্বর ‘ঢাকা দখল’ কর্মসূচি ঘোষণা করে।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এরশাদ সরকার হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। রাজপথে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। মৃত্যু হয় অনেকের। খালেদা জিয়াকে পূর্বাণী হোটেল থেকে আটক করে গৃহবন্দী করা হয়।
১৯৮৭ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি পান। পরে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেন, স্বৈরশাসককে ক্ষমতা থেকে নামাতে মৃত্যুর জন্যও প্রস্তুত আছেন তিনি।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে পতন হয় স্বৈরাচারের। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয় পেয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া।
প্রথম মেয়াদে তিনি শিল্পের বেসরকারিকরণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেন। দেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা করেন। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি এবং নারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করেন।
খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৯৬ সালে। তখন বিরোধীদলগুলো নির্বাচন বর্জন করে। দাবি তোলা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। সংসদ গঠন করে বিরোধীদের এই দাবি পূরণ করা হয়। অল্প সময়ের এই সংসদ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করে। ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের পথ সুগম করতে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়।
১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে বিএনপি হেরে যায় আওয়ামী লীগের কাছে। সংসদীয় ইতিহাসে বৃহত্তম বিরোধী দল হয় বিএনপি। পরে জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটকে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করেন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে একচেটিয়া জয় পায় এই জোট। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। এই মেয়াদে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশের বেশি। মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮২ ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের ১ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
২০০৬ সালে সরকারের মেয়াদ শেষ হয় ২৯ অক্টোবর। এর একদিন আগে সারাদেশে লগি ও বৈঠা নিয়ে নারকীয় তাণ্ডব চালায় আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে বিচারপতি কে এম হাসানকে প্রত্যাখ্যান করে দলটি। রাজধানীতে ছড়িয়ে যায় দাঙ্গা। এতে জামায়াত ও বিএনপির অনেককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে চেপে বসে সেনাসমর্থিত ওয়ান ইলাভেন সরকার।
তখনকার সরকার খালেদা জিয়া এবং তার দুই সন্তানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে। নির্যাতন করা হয় বড় ছেলে তারেক রহমানকে। তাকে খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। তার বিরুদ্ধে সাজানো হয় বেশ কয়েকটি মামলা।
ওয়ান ইলাভেন সরকারের সাজানো প্লটের ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ২০০৯ সালে সেনানিবাসের বাসভবন থেকে বের করে দেওয়া হয় জিয়া পরিবারকে। পরে গুলশানে তার ভাই সাঈদ ইস্কান্দারের বাসায় চলে যেতে হয়েছে তাদের।
ওই মেয়াদে আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা বাতিল করিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ। এ কারণে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি-জামায়তসহ বিরোধীরা। এতে আওয়ামী লীগ ২৩২টি আসনে জয় পায়।
২০১৫ সালে ছোট ছেলে আরাফাত রহমানের মৃত্যু হয়। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়ে খালেদা জিয়াকে। পরে ২০১৯ সালে চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার স্থানান্তর করা হয়। ২০২০ সালে বিদেশ ভ্রমণ না করা এবং গুলশানে তার বাড়িতে থাকার শর্তে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেওয়া হয়। সেইসাথে রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়। পরে কয়েকবার করে সাজা স্থগিত করার ছয় মাসের মেয়াদ মঞ্জুর করা হয়।
এই সময়টুকুর মধ্যে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, হার্ট, চোখসহ বিভিন্ন রোগে কাবু হয়ে যান খালেদা জিয়া। এ কারণে বিরতি দিয়ে একরকম হাসপাতালেই কাটাতে হয় তাকে। বেশ কয়েকবার শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে উঠলেও দেশের বাইরে চিকিৎসা করার অনুমতি দেয়নি শেখ হাসিনা সরকার। বন্দি জীবনের বড় অংশজুড়ে বেগম খালেদা জিয়ার ঠিকানা হয়ে উঠে ‘এভারকেয়ার হাসপাতাল’। ৬ আগস্ট মুক্ত হওয়ার সময় তিনি এই হাসপাতালেই ছিলেন। এর আগে আগস্টের পাঁচ তারিখ শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় টেলিভিশনে এ দৃশ্য দেখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন তিনি।
খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, এই দিনটা দেখার খুব প্রয়োজন ছিল।’
মুক্ত হয়ে এক বিবৃতিতে সাহসি ছাত্র-জনতার প্রশংসা করেন খালেদা জিয়া। এই আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের পরিবার এবং আহতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন নিজের দলের নেতাকর্মীদের। সেইসাথে সংযম দেখানোর অনুরোধ করেন তিনি।
বেগম খালেদা জিয়া ‘সংযম’ দেখিয়েছেন জীবনের সবটাজুড়ে। প্রথমবার স্বামীকে হারিয়ে। এরপর রাজনীতিতে নেমে, দেশের মানুষের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন নিজেকে। তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন সন্তান আরাফাত রহমান। নির্যাতনের মুখে দেশের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হন বড় সন্তান তারেক রহমান। তবে বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকার পরও দেশের মাটিতেই থেকে গেছেন খালেদা জিয়া।
তিনি কি একা!
না। তাঁর সঙ্গে গোটা বাংলাদেশ।
শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ: সাংবাদিক