
ভূমিকা: প্রযুক্তির নতুন সহযাত্রী
কয়েক বছর আগেও “AI” বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুনলেই মনে হতো—এটা বুঝি ভবিষ্যতের কোনো জাদুকরী প্রযুক্তি। অথচ আজ, এটি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—ফোনে চ্যাটবট, ইউটিউবের সাজেস্টেড ভিডিও, এমনকি বাংলায় গল্প লিখতেও সাহায্য করছে AI।
তবে এই প্রযুক্তি একদিনে আসেনি। এর পেছনে আছে কয়েক দশকের গবেষণা, স্বপ্ন, সাফল্য আর ব্যর্থতার এক চমকপ্রদ যাত্রা।

AI-এর ধারণা প্রথম আসে গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং ১৯৫০ সালে একটা প্রশ্ন তোলেন: “যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?” তিনি এমন এক পরীক্ষা প্রস্তাব করেন, যেটায় দেখা হবে, কোনো মেশিন মানুষের মতো আচরণ করতে পারছে কি না। এটাকেই বলা হয় “টুরিং টেস্ট”।
এরপর ১৯৫৬ সালে ডার্টমাউথ কলেজে একটা গ্রীষ্মকালীন কর্মশালায় কয়েকজন বিজ্ঞানী একত্র হয়ে সিদ্ধান্ত নেন—এই “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াস গবেষণা দরকার। সেখান থেকেই আসলে AI-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু।
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা আশা করছিলেন, শিগগিরই মেশিন মানুষের মতো চিন্তা করতে পারবে। কিছু প্রাথমিক সাফল্য এসেছিল, যেমন—চেক খেলা কম্পিউটার, গাণিতিক সমস্যা সমাধানে দক্ষ সফটওয়্যার। কিন্তু তখনকার কম্পিউটারগুলো দুর্বল, মেমোরি কম, প্রোগ্রাম লেখার সুযোগ সীমিত।
ফলে খুব শিগগিরই মানুষ বুঝে গেল, এই প্রযুক্তি এত সহজে মানুষের মতো হতে পারবে না। বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়, অনেক গবেষণা থেমে যায়। এই সময়টাকে বলা হয় AI-এর “শীতকাল” বা AI Winter।
৮০’র দশকে এসে এক্সপার্ট সিস্টেম নামে এক নতুন পদ্ধতির প্রচলন হয়। এখানে বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান কম্পিউটারকে “শেখানো” হতো নিয়মের মাধ্যমে। যেমন, একজন ডাক্তার যেভাবে রোগ চিহ্নিত করেন, সেই নিয়ম কম্পিউটারে বসিয়ে দেওয়া হতো।
কিন্তু সমস্যা হলো, বাস্তব জীবন এত নিয়মে চলে না। পরিবর্তন, ব্যতিক্রম, অনিশ্চয়তা—এসব সামলানো কঠিন হয়ে পড়ল। তাই আবার গবেষকরা ভাবলেন, “কম্পিউটার যদি নিজেই শিখতে পারত!”
সেখান থেকেই আসলো মেশিন লার্নিং (Machine Learning)। আর এরপর শুরু হয় বড় পরিবর্তন।
২০০০ সালের পর থেকে প্রযুক্তি পাল্টাতে শুরু করল। কম্পিউটার হলো অনেক দ্রুত, ইন্টারনেট থেকে ডেটা পাওয়া সহজ হলো, আর গবেষকরা নতুন এক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকলেন—Deep Learning।
২০১২ সালে “AlexNet” নামে একটি মডেল প্রথমবারের মতো ছবিচিনে চমক দেখাল। এরপর থেকে ছবি চিনতে, ভাষা বুঝতে, এমনকি কথোপকথনে অংশ নিতে AI মডেলগুলো সক্ষম হয়ে উঠল।
এই সময় থেকেই AI আমাদের মোবাইলে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, গুগল সার্চে, এমনকি কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সেও জায়গা করে নেয়।
বর্তমানে AI এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখানে এটা কেবল গাণিতিক জিনিস নয়, বরং সৃজনশীল কাজে ব্যবহার হচ্ছে। আপনি চ্যাটজিপিটি-তে কবিতা লিখতে বলেন, Canva-তে ছবি বানান, YouTube-এ ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তৈরি করেন—সবেতেই AI কাজ করছে।
এই AI-কে বলা হয় “জেনারেটিভ AI”—মানে যা নতুন কিছু তৈরি করতে পারে। GPT, DALL-E, MidJourney, Claude – এরা এখন মানুষের সাথে কথোপকথন করে, ছবি আঁকে, এমনকি মিউজিকও বানায়।
AI অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এর কিছু নেতিবাচক দিকও আছে যেগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়:
বাংলাদেশে AI নিয়ে কাজের শুরু হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে AI ব্যবহার হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ফিনটেক, এবং শিক্ষা খাতে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডেটা সায়েন্স ও AI বিষয় পড়ানো শুরু হয়েছে। স্টার্টআপগুলো AI ভিত্তিক সল্যুশন আনছে গ্রামবাংলার কৃষকের জন্য কিংবা শহরের শিক্ষার্থীদের জন্য।
তবে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ—দক্ষ জনবল তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন, ও নীতিগত দিকগুলো স্পষ্ট করা।
AI আজকের বাস্তবতা। এটা নিয়ে ভয় পেতে হবে না, কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে। AI যেন আমাদের সহায়ক হয়, আমাদের জায়গা না নেয়—এই ভারসাম্যটা রাখা জরুরি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রযুক্তির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের এখনই প্রয়োজন নীতিগত পরিকল্পনা, শিক্ষা ও জনসচেতনতা। আমাদের বুদ্ধিমত্তা আর যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা—দুটো একসঙ্গে চললে ভবিষ্যত হবে আরও উজ্জ্বল, আরও মানবিক।