জালিমের মৃত্যুর খবরে ইন্নালিল্লাহ পড়া যায় কি?

বিশ্লেষণ3 months ago27 Views

জুলাই গণহত্যার পর বহু জল গড়িয়ে গেছে। আমি যখন আলাপ করছি, তখনো শেখ হাসিনার রায় হয়নি। আর মাত্র ঘণ্টাখানেক সময়, তারপরই সব খোলাসা হয়ে যাবে।

আপনারা যারা পরে যুক্ত হয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে জেনে গেছেন কি রায় এসেছে আদালত থেকে।

তিনি তো গণহত্যা চালিয়েছেন। গণহত্যার সাজা সর্বোচ্চই হওয়ার কথা। অর্থাৎ শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় এসেছে, এইতো!

ওকে, ফাঁসির রায় হওয়া মানেই তো ফাঁসি হয়ে যাওয়া নয়। শেখ হাসিনা এখন দিল্লিতে বসে আছেন। ফাঁসি দিতে হলে সেখান থেকে আগে তাকে ফেরত আনতে হবে। তারপর রায় কার্যকর করা যাবে।

ফেরত দেবে কি দেবে না, সেটা দুশীলদেশ তথা ভারত সরকারের মর্জির ওপর নির্ভর করছে। অবশ্য বাংলাদেশ সরকার যদি সিরিয়াস হয়, তাহলে দিতে বাধ্য।

ধরুন শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা হলো। তারপর ফাঁসি কার্যকর হলো। তখন কি আপনারা ইন্নালিল্লাহ পড়বেন?

অথবা ধরুন, তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলো না, তার স্বাভাবিক মৃত্যু হলো। মৃত্যুর খবর শুনার পর কি ইন্নালিল্লাহ পড়বেন?

জানি, অনেকেই পড়বেন না। কেউ কেউ পড়বেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

কেউ হয়তো বলবেন, শেখ হাসিনার মতো জালিমের মৃত্যুতে ইন্নালিল্লাহ পড়া জায়েজ হবে না।

যারা আলহামদুলিল্লাহ পড়বেন, তারা কী ভেবে পড়বেন?

‘আলহামদুলিল্লাহ’ হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। আল্লাহ যদি কোনো জুলুম দূর করেন, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ পড়তেই পারেন। এই আলহামদুলিল্লাহ মূলত জালেমের মৃত্যুতে নয়, বরং জুলুম থেকে মুক্তির কৃতজ্ঞতা।

মিশরের ফেরাউনকে ডুবিয়ে মারার মাধ্যমে আল্লাহ বনি ইসরাইলকে রক্ষা করেছিলেন। দিনটি ছিলো আশুরার। এই দিনে ইসলামের ইতিহাসে বহু ঘটনা আছে। ফেরাউনের মৃত্যুর পর শোকর প্রকাশ করেছিলো বনি ইসরাইলরা। এই শোকর মৃত্যুকে উদযাপনের জন্য নয়, ছিলো নিপীড়ন থেকে মুক্তির।

বড় জালেম বা বিপজ্জনক শত্রুর ধ্বংস হওয়ার পর রাসুল (সা.) আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

কিন্তু বিদ্বেষ নিয়ে মৃত্যুকে উদযাপন করা অনুচিত

সুনানে তিরমিজীর ২৫০৬ নাম্বার হাদিসে আছে, ‘তোমার ভাইয়ের বিপদে আনন্দিত হয়ো না। কেননা এতে আল্লাহ তার প্রতি করুণা করবেন এবং তোমাকে বিপদে ফেলবেন।’

আল্লামা দেলাওয়র হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুতে যারা আনন্দ করেছিলেন, তাদের মাথায় হয়তো এই সত্যটা ছিলো না।

সাঈদী অবিচারের শিকার হয়েছেন। তার নামে আনা হয়েছিলো মিথ্যা অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে ভুয়া সাক্ষী দেওয়ার জন্য জোর করা হয়েছিলো সুখরঞ্জন বালিকে। কিন্তু সব লোক তো একরকম না।

সুখরঞ্জন বালি নীতিবান এবং একরোখা মানুষ। তাকে কোনোভাবে রাজি করা যায়নি। পরে তাকে গুম করে দেওয়া হলো। তার ওপর নির্যাতনের কাহিনী আমাদের জানা।

স্যালুট সুখরঞ্জন বালি। নতুন বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে তাঁর মতো নীতিবান লোকদের গড়ে দেওয়া খুঁটির ওপর।

সুখরঞ্জন সাক্ষী দেননি, তাই বলে বানোয়াট মামলা আটকে রাখেনি আওয়ামী লীগ। একটা কেলেঙ্কারির রায় দিয়ে দেওয়া হলো। শেষমেষ কারাগার থেকেই মহান আল্লাহর কাছে চলে গেলেন সাঈদী।

তরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেলো ‘ইন্নালিল্লাহ’ পড়ার ধুম।

আওয়ামী লীগার, ছাত্রলীগাররাও ‘ইন্নালিল্লাহ’ পড়লেন। এতে তাদের পদ গেলো। ইন্নালিল্লাহ পড়ার দায়ে কারো চাকরি গেলো। সাধরণদেরকে কর্নার করা হলো।

সেই দুঃখ পুষে রেখেছেন অনেকেই। ঠিক করে রেখেছেন শেখ হাসিনার মৃত্যু হলেও ইন্নালিল্লহ পরবেন না তারা। কারণ, শেখ হাসিনা একজন জালেম, পনেরো বছর ধরে তিনি জুলুম করেছেন। কয়েকটি গণহত্যা হয়েছে সরাসরি তার নির্দেশে।

সব অভিযোগ ঠিক আছে। তার অপরাধের যে ট্র্যায়াল হয়েছে, সেখানেও অস্বচ্ছতা দেখা যায়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনার মতো জালেমদের মৃত্যু হলে ‘ইন্নালিল্লাহ’ পড়া জায়েজ হবে কি না?

এর ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন ইসলামী পন্ডিতরা। তবে অতো গভীরে না গিয়ে আমরাও কিছুটা বোঝার চেষ্টা করতে পারি।

সহজলভ্য কিছু দলিল ঘেঁটে যা বুঝতে পারলাম, ইন্নালিল্লাহ একটি তাসলিম বা সত্যকে স্বীকার করে নেওয়া।

ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, সূরা বাকারর ১৫৬ নাম্বার আয়াতে আছে। এর মানে হলো- নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য। আর আমরা আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবো।

এই বাক্যটি মৃত ব্যক্তির চরিত্রের বিচার নয়; বরং একটি চিরন্তন সত্যকে স্বীকার করা। যিনি মারা গেছেন, তিনি জালিম বা ভালো আমলের লোক, সেটা এখানে বিবেচনার বিষয় নয়। প্রতিটি মানুষকে চলে যেতে হয়। একজন ভালো লোককে যেমন যেতে হয়, তেমনি একজন জালিমকেও। সুতরাং কোনো জালিম অথবা ন্যায়পরায়ণ কোনো আদিলের মৃত্যু, এই দুইয়ের মধ্যেই আছে ‘চলে যাওয়া’র সত্য। আমাকেও একদিন যেতে হবে। এই সত্যটা স্বীকার করে নিতে আমি তো কোনো বাধা দেখছি না।

হ্যাঁ, জালিম বা অপরাধীর মৃত্যুতে তার জন্য আপনাকে দোয়া করতেই হবে, সেটা বাধ্যতামূলক নয়। তেমনি তার মৃত্যু উপলক্ষ্যে ইন্নালিল্লাহ পড়তেই হবে, বিষয়টা এমনও নয়। কিন্তু কেউ যদি জালিমের মৃত্যুতে ‘ইন্নালিল্লাহ’ পড়েন, তাকে বাধা দেওয়া বা তাকে নিয়ে তামাশা করাটাও বোধহয় ঠিক হবে না।

মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিলেন ষড়যন্ত্রকারী। জালিম, মিথ্যাবাদী। তার মৃত্যুর পর রাসুল (সা.) ইন্নালিল্লাহ পড়েছেন।

কেবল মৃত্যুতে নয়, বিপদবেলাতেও ইন্নালিল্লাহ পড়া যায়।

অনলাইনে সহজে পাওয়া যায়, এমন কিছু ডকুমেন্টে দেখলাম, অমুসলিমের মৃত্যুতেও ইন্নালিল্লাহ পড়তে বাধা নেই। কারণ এটি একটি ঘোষণা। এই ঘোষণা আমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। অমুসলিমরা মৃত্যুর পর কোথায় যাবেন? আল্লাহর কাছেই তো? ইসলাম ধর্ম তো সেটাই বলে।

অমুসলিমের মৃত্যুতে তার জন্য শোক জানাতেও বাধা নেই ইসলামে। তবে তাদের জন্য মাগফেরাত চাইতে নিষেধ করা হয়েছে।

একবার এক ইহুদির লাশ নিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো রাসুল (সা.) এর সামনে দিয়ে। তিনি তখন বসেছিলেন। লাশ দেখে উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন। সাহাবারা জানালেন, এই লাশ তো এক ইহুদির। জবাবে রাসুল (সা.) জানিয়েছিলেন- তিনিও একজন আদম সন্তান। দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, তার সাথে আর দুশমনি নেই।

সুতরাং কেউ মারা গেলে, তার লাশ বা মরদেহকে অপমান করা ঠিক না। লড়াইয়ের মাঠে শত্রুর মৃত্যু হলে লাশ বিকৃত করতে নিষেধ করতেন রাসুল (সা.)। শত্রুর লাশ টেনে-হিঁচড়ে অপমান করা হয়নি তখন। জালিমের লাশ দাফনে অবহেলা করেননি তিনি।

তাহলে আমরা কেন জালিমের ওপর জুলুম করবো?

জালিম পরাজিত হয়েছে। নতুন করে যেন জুলুম ফিরে না আসে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে আমাদের। তবে সতর্ক থাকতে গিয়ে পরাজিত জালিমের ওপর জুলুম করা যাবে না।

আওয়ামী লীগ জুলুম করেছে, সেটা আমাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে না। আমরা জালিম হতে পারি না। আমরা চাই ন্যায়বিচার, তারা যতটুকু অপরাধ করেছেন, ততটুকু শাস্তি। এর চাইতে একটুও বেশি না। আবার কমও না।

দেখুন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ এর আলাপ

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...