শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর আবার আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। কেবল বাংলাদেশে থেকেই নয়. এই সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াতেও। একের পর এক গুপ্তহত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ‘র’-এর কার্যক্রম এখন বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগের নাম।
কানাডার মাটিতে শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যার ঘটনায় প্রথম প্রকাশ্যে ভারতকে দায়ী করে দেশটি। এর জেরে ভারত-কানাডা সম্পর্কে দেখা দেয় নজিরবিহীন কূটনৈতিক টানাপোড়েন। হাদি হত্যার পর সেই প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে এনেছে কানাডা প্রবাসী শিখ সম্প্রদায়।
এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিখ সংগঠন ‘শিখ ফর জাস্টিস’ হাদি হত্যার সঙ্গে জড়িতদের ধরিয়ে দিতে ৫৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। সংগঠনটির দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনেও ভারত ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সম্পৃক্ততা রয়েছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে শিখ নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্রে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ তোলে মার্কিন বিচার বিভাগ। এই মামলায় ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্তকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করে চেক প্রজাতন্ত্র। মার্কিন প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, পান্নুনকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি জোগাড়ের চেষ্টা করেছিলেন নিখিল গুপ্ত। পান্নুন খালিস্তানপন্থী সংগঠন ‘শিখ ফর জাস্টিস’-এর শীর্ষ নেতা।
ভারতীয় গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ শুধু উত্তর আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত শিখদের হয়রানি ও হুমকির অভিযোগ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (ABC)। প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে নিজ্জর হত্যা ও যুক্তরাষ্ট্রে পান্নুন হত্যাচেষ্টার যোগসূত্র তুলে ধরা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে শিখ নেতাদের ধারণা, বাংলাদেশে শরিফ ওসমান হাদি হত্যা একই ধরনের আন্তঃসীমান্ত গুপ্তহত্যা মিশনে র অংশ হতে পারে।
কানাডা প্রবাসী শিখ নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুন এক ভিডিও বার্তায় ওসমান হাদিকে ‘শহীদ’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে ‘শিখ ফর জাস্টিস’ এর বিবৃতিতে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী, হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা ঘটনার পর ভারতে পালিয়ে গেছে। তাই হত্যাকারীদের অবস্থান শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং প্রত্যর্পণে সহায়ক নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারলে ৫৫ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
সংগঠনটির জেনারেল কাউন্সেল পান্নুনের দাবি, এই হত্যার ধরন ২০২৩ সালের ১৮ জুন কানাডায় শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিল রয়েছে।
নিজ্জর ছিলেন কানাডার গুরু নানক শিখ গুরুদুয়ারার প্রেসিডেন্ট। ৪৫ বছর বয়সী এই নেতা জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে কানাডায় বসবাস করছিলেন। তিনি পাঞ্জাবভিত্তিক স্বাধীন ‘খালিস্তান’ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ভারত তাকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির আগ থেকেই পাঞ্জাব অঞ্চলকে ঘিরে স্বাধীন খালিস্তানের দাবি উঠে আসে। এই আন্দোলনকে বরাবরই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে ভারত সরকার। দশকের পর দশক ধরে চলা এই সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন হাজারো মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হলেও নিজ্জর হত্যার পর কানাডা প্রবাসী শিখদের মধ্যে নতুন করে জ্বলে উঠেছে ক্ষোভের আগুন।
আর সেই আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে- বাংলাদেশে শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড।
একটি রাষ্ট্র যদি বারবার নিজের সীমান্ত পেরিয়ে গোপন হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়, তবে তা শুধু একটি দেশের সার্বভৌমত্ব নয়, পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। হাদি হত্যার মাধ্যমে সেই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো: গুপ্তহত্যা কি হয়ে উঠছে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির নীরব অস্ত্র? – ইনফোজা প্রতিবেদন
