আলিফ লায়েলার সেই বাগদাদ। খলিফা হারুন অর রশিদের সময় ছিলো আরব্য রজনীর গল্পের মতোই। এই খলিফাকে বলা হয় স্বর্ণযুগের সম্রাট। তিনি ছিলেন ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ। ছিলেন জ্ঞান ও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। আলিফ লায়েলার ফ্যান্টাসির বাগদাদ ছিলো আশার বাতিঘর। আর জ্ঞানের রাজধানী।
চলুন একটু উঁকি মেরে আসি সিন্দাবাদের সময় থেকে।
রোমাঞ্চকর বাণিজ্যযাত্রা শেষে সিন্দাবাদের জাহাজ নোঙর করেছে বন্দরে। নাবিকেরা নামছে। বন্দরজুড়ে কোলাহল। এইসব গল্প কল্পনা হলেও বাস্তব থেকে খুব একটা দূরে ছিলো না।
আব্বাসিয় খলিফা হারুন অর রশিদের সময় বাগদাদ ছিলো ঐশ্বর্যে ভরা। প্রজাদের কাছে হারুন অর রশিদ ছিলেন দয়ালূ। আর অপরাধীদের কাছে আতঙ্ক। তার ন্যায়পরায়ণতা নিয়েও প্রচলিত আছে নানা গল্প।
১২১৩ বছর আগে ২৪ মার্চ তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। রেখে যান সুশাসনের উত্তরাধিকার। আর জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার। বাগদাদের জ্ঞান ইউরোপকে বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধকার থেকে বের করে আনতে অনুপ্রাণিত করেছে।
খৃস্টের জন্মের ৪৭৬ বছর আগে পতনের দিকে যেতে থাকে রোমান সাম্রাজ্য। তখন বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ে জর্জরিত হয় ইউরোপ। ওই সময় শতাব্দী থেকে শতাব্দীর পুরনো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হতো।
মধ্যযুগে এসে বাগদাদ শহর সারা বিশ্বের জন্য আশার বাতিঘর হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। হারুন অর রশিদের সময় তৈরি করা হয় ‘বাইত আল হিকমাহ’। এর অর্থ ‘প্রজ্ঞার ঘর’। এই ঘরে তখনকার ডাকসাইটে দার্শনিক, কবি, গণিতবিদ এবং জ্যোতিষীদের চর্চা ছিলো। জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে খৃস্টান, ইহুদি কিংবা মুসলমানকে আলাদা চোখে দেখা হতো না। এমনকি আগুনপূজারি জরথুস্ট্রবাদিদেরও নিরাপদ আশ্রয় ছিলো বাগদাদ।
হারুন অর রশিদ ছিলেন পঞ্চম আব্বাসীয় খলিফা। তিনি ৭৮৬ থেকে ৮০৯ সাল পর্যন্ত বাগদাদ শাসন করেছিলেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে জৌলুসপূর্ণ খলিফা ছিলেন বলে তুর্কী সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের কাছে মন্তব্য করেন আনকারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহিদ বোজকার্ট।
বোজকার্ট ইসলামের ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, হারুন অর রশিদ পশ্চিমা সাহিত্যে ইসলামিক স্বর্ণযুগের শীর্ষ খলিফা হিসেবেও পরিচিত।পশ্চিম যখন আলোকিত হয়। তখন তাদের আলোর একটি বড় উৎস ছিল ইসলামিক পণ্ডিতরা। এই আলোর শেকড় হারুন অর রশিদ থেকেই এসেছে।’
অন্য এক ইতিহাসবিদ, উলুদাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদেম আপাক। তিনি উল্লেখ করেন, হারুন অর রশিদকে তার সময়ের সেরা শিক্ষকেরা শিক্ষিত করে তুলেছিলেন। একজন জ্ঞানী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গড়ে তোলার জন্যই তাকে এই শিক্ষা দেওয়া হয়।
খাবিব জেইয়াত তাকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে পবিত্র কুরআন পড়তে হয়। আলী হামজা আল-কিসাই তাকে বাক্য গঠন শিখিয়েছেন। ইমাম মালিক হারুন অর রশিদকে হাদিস এবং ইসলামিক আইনের উপরও পাণ্ডিত্য দিয়েছিলেন।
পঞ্চম আব্বাসীয় খলিফা রশিদ নিজেও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানে বিনিয়োগ করেছেন। শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে গুরুত্ব দিয়েছেন সবচাইতে বেশি। বোজকার্ট বলেন, ‘খলিফার সবচেয়ে বেশি জোর ছিলো মেধাতন্ত্রর ওপর। তিনি মেধাবিদের মূল্য দিতেন। এক্ষেত্রে কে কোন ধর্মের সেটা বিবেচনা করেননি। তিনি জ্ঞান এবং প্রতিভার উপর ভিত্তি করে প্রশাসন সাজাতেন। তার উজির ছিলেন খৃস্টান। চিকিৎসকদের অনেকেই খৃস্টান ও জরথুস্ট্রবাদি ছিলেন। বিজ্ঞান এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল রশিদের। তিনি বিজ্ঞানের পথ প্রশস্ত করতে চেয়েছেন। ’
আব্বাসীয়রা শুধুমাত্র বিজয়ের দিকে মন না দিয়ে প্রতিষ্ঠান গড়তে চেয়েছেন। তারা বড় বড় শহর তৈরি করতে থাকেন। এতে করে বাগদাদ তাদের সাংস্কৃতিক অগ্রগতির প্রতীক হয়ে উঠে। বাগদাদ পরিণত হয় বিশ্বের সবচাইতে জনবহুল শহরে।
খলিফার হাউস অব উইজডম একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী জ্ঞান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সেখান থেকে শিল্প ও বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছিল। হারুন অর রশিদের আমলেই এমন এক বিশাল লাইব্রেরি নির্মাণের ধারণা বাস্তবায়ন হয়। অনুবাদের জন্য তিনি সারাবিশ্ব থেকে বই আনতে শুরু করেন। তার ছেলে আল মামুনের মেয়াদে প্রক্রিয়াটি আরো এগিয়ে যায়।’
বাইত আল হিকমাহ প্রাচীন গ্রীক এবং আধুনিক পশ্চিমা দর্শনের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করেছিল। খলিফার উদ্যোগে মিশরীয়, বাইজেন্টাইন, সাসানিদ এবং রোমান দেশগুলো থেকে প্রাচীন গ্রীক প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করে। নাহয় ওগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে যেতো।
রাশিদের ছেলে আল মামুনের মেয়াদে ইতিবাচক বিজ্ঞান ও দর্শনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। কারণ তিনি তার বাবার রেখে যাওয়া পথেই ছিলেন। নিজে ইসলামের ছায়ায় থেকেছেন। আর সেই ছায়ায় থেকেই মানবতা ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করেছেন।
আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাতের গল্পেও হারুন অর রশিদের পরিচয় পাওয়া যায়। ওখান থেকেই ধারণা নেওয়া যায় ওই সময় সাংস্কৃতিক কাজগুলো কেমন হতো।
অধ্যাপক নাহিদ বোজকার্ট টিআরটিকে বলেন, ‘হারুন অর রশিদ এবং তার ছেলে আল মামুনের কাজ থেকেই পশ্চিমারা আলো পেয়েছিলো। তাদের নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ এসেছিলো।’
হারুন এবং আল মামুনের চেস্টায় বাইত আল হিকমাহ গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, ভূগোল, দর্শন, সাহিত্যসহ মানবিক ও বিজ্ঞান অধ্যয়নে অপ্রতিদ্ব›দ্বী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। শিল্পকলার পাশাপাশি আলকেমি এবং জ্যোতিষশাস্ত্রেও এগিয়ে ছিলো।
আল মামুন ৬৮ জনের সমন্বয়ে একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিনিধিদল তৈরি করেছিলেন। এই দলে ছিলেন ওইসময়ের মহান পলিম্যাথ আল খোয়ারিজমি। এই দলটি পরিমাপ নিয়ে কাজ করে। ভারতীয় ও গ্রিক ঐতিহ্য থেকে বিভিন্ন দার্শনিক পদ্ধতি নিয়েও পরীক্ষা করে। এই গবেষণাটি অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশসহ বিশ্বের মানচিত্র আঁকতে সাহায্য করেছিল। দলটি পৃথিবীর নিরক্ষীয় বেল্টের দৈর্ঘ্যও পরিমাপ করেছিলো। বিশ্বের মানচিত্র আঁকা ছাড়াও পরিমাপের সহজ পদ্ধতিগুলো তৈরি করেছিলো। এছাড়া, আল মামুনের অনুরোধে আল খোয়ারিজমি ৭০০টি সূত্র তৈরি করেছিলেন।
তেরশ’ শতকে বাইত আল হিকমাহ অবরোধ করে মঙ্গোলরা। এরা বুদ্ধিবৃত্তিক এই কেন্দ্রটিতে লুটপাট চালায়। শিল্প ও বিজ্ঞানের সমৃদ্ধি মুছে দেওয়ার চেস্টা করে। অনেকটা সফল হয় তারা। তবে যতটুকু থেকে যায় সেটুকুই পরবর্তীতে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্য কুড়িয়ে নেয়।
উপস্থাপনা: মশিউর কায়েস
লেখক: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
প্রযোজনা: সজল ফকির