বিশ্বের লাখো দক্ষ তরুণের কাছে যুক্তরাষ্ট্র মানেই কাজ আর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের জায়গা। আর সেই স্বপ্নের মূল চাবিকাঠি হলো H-1B ভিসা। এই ভিসা বিদেশি পেশাজীবীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় কর্মভিসা, বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্য ও গবেষণার মতো বিশেষ দক্ষতার কাজে।
কিন্তু এই ভিসার শুরু কোথায়? আর আজ পর্যন্ত কোন দেশের নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি এই সুযোগ পেয়েছেন? চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে H-1B ভিসা হলো বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীদের জন্য একটি অস্থায়ী কাজের ভিসা। এর ইতিহাস ১৯৫২ সালে শুরু, যখন Immigration and Nationality Act (INA) চালু হয়। তখন “Specialty Occupations” ধারার মাধ্যমে বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর ও গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রে আসতে পারতেন।
১৯৫২–১৯৬৫ সালে H-1 ভিসার প্রাথমিক সংস্করণ চালু হয়। এটি সীমিত সংখ্যায় ছিল ও কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে দেয়া হত। ১৯৬৫–১৯৮০ সালে প্রযুক্তি, গবেষণা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদেশী পেশাজীবীদের প্রবেশ বৃদ্ধি পায়। এই সময় H-2 ভিসা চালু হয়: H-2A কৃষি শ্রমিকদের জন্য এবং H-2B অ-কৃষি শ্রমিকদের জন্য, যেমন হোটেল, ল্যান্ডস্কেপ ও নির্মাণ।
১৯৯০ সালে Immigration Act of 1990 পাশ হয় এবং H-1B ভিসা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। বার্ষিক ভিসার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় এবং যোগ্যতার মানদণ্ড স্পষ্ট করা হয়। লক্ষ্য ছিল আইটি, বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ও ব্যবসায়িক বিশেষজ্ঞদের আনা।
২০০৪ সালে বার্ষিক H-1B কোটা নির্ধারণ করা হয় ৬৫,০০০, এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাস্টার্স বা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনকারীদের জন্য অতিরিক্ত ২০,০০০ ভিসা চালু হয়।
আজকের দিনে H-1B ভিসা প্রযুক্তি ও উচ্চ শিক্ষিত পেশাজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি মোট ৬ বছরের জন্য দেয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইটি ও বিশেষায়িত শিল্প খাতের জন্য এটি একটি মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
প্রযুক্তি বিপ্লবের যুগে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় কোম্পানি যেমন Google, Microsoft, Amazon, Meta বিপুল সংখ্যক বিদেশী বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে শুরু করে। বিশেষ করে ভারত, চীন, বাংলাদেশ, ফিলিপাইনসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে হাজার হাজার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ H-1B ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন।
ভিসার চাহিদা এত বেশি যে, প্রায়শই লটারির মাধ্যমে বাছাই করা হয়। H-1B ভিসাধারীর স্ত্রী বা স্বামী H-4 ভিসা পেতে পারেন এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা কাজ করার অনুমতিও পান।
অনেকেই H-1B ভিসার মাধ্যমে গ্রিনকার্ডের আবেদন করে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। গ্রিনকার্ড পাওয়ার ৫ বছর পর তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পান। একারণে এই ভিসার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়।
২০২৪ অর্থবছরে H-1B ভিসা অনুমোদনের ক্ষেত্রে দেশভিত্তিক বিতরণের তথ্য USCIS-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট অনুমোদিত H-1B পিটিশনের মধ্যে ৭১% ছিল ভারতের নাগরিকদের জন্য। চীন ছিল দ্বিতীয় স্থানে, যার জন্য অনুমোদিত পিটিশনের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২%। ভারত ও চীন মিলিয়ে মোট অনুমোদনের ৮৩% ছিল।
নিচে ২০২৪ সালের জন্য শীর্ষ ১০টি দেশের H-1B ভিসা অনুমোদনের সংখ্যা ও শতাংশের একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| ক্রম | দেশ | অনুমোদিত পিটিশনের সংখ্যা | শতাংশ (%) |
|---|---|---|---|
| ১ | ভারত | ২,৮৩,৩৯৭ | ৭১.০% |
| ২ | চীন | ৪৬,৬৮০ | ১১.৭% |
| ৩ | ফিলিপাইনস | ৫,২৪৮ | ১.৩% |
| ৪ | কানাডা | ৪,২২২ | ১.১% |
| ৫ | দক্ষিণ কোরিয়া | ৩,৯৮৩ | ১.০% |
| ৬ | মেক্সিকো | ৩,৩৩৩ | <১% |
| ৭ | তাইওয়ান | ৩,০৯৯ | <১% |
| ৮ | পাকিস্তান | ৩,০৫২ | <১% |
| ৯ | ব্রাজিল | ২,৬৩৮ | <১% |
| ১০ | নাইজেরিয়া | ২,২৭৩ | <১% |
তথ্যসূত্র : https://www.uscis.gov/sites/default/files/document/legal-docs/ola_signed_fy2024_h1b_petitions.pdf
H-1B ভিসা নিয়ে বরাবরই বিতর্ক আছে। মার্কিন প্রশাসন বলছে, বিদেশি কর্মীদের উপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। সমালোচকরা বলছেন, নতুন আরোপিত বেশি ফি আর কঠোর শর্ত ছোট কোম্পানিগুলোর জন্য বিরাট চাপ তৈরি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র বরং প্রতিভা হারাবে। এটি ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে, যারা দক্ষ কর্মী পাঠানোর উপর নির্ভরশীল।