ইবনে সিনা, জ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তার নাম নেই। তবে একজন চিকিৎসাবিদ হিসেবে তিনি বেশি পরিচিত। দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যার ওপর তার দখল অবাক করার মতো। তাকে বলা হয় আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার জনক। প্রাক আধুনিক যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক। সব্যসাচী এই দার্শনিকের জীবনও ছিলো বৈচিত্রে ভরা। ইবনে সিনাকে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

একেবারে বালকবেলা থেকেই প্রশ্ন করতে জানতেন ইবনে সিনা। প্রশ্ন করে করতেই তিনি পরিণত হয়েছেন প্রাজ্ঞ ব্যক্তিতে। তার বাবা আবদুল্লাহ এবং মা সিতারা ছিলেন ইসমাইলিয়। ছেলেকেও গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেভাবে। কিন্তু ইসমাইলিয় ধারা নিয়ে খটকা তৈরি হয় ছেলের মনে। তিনি প্রশ্ন করতে থাকেন। পারিবারিক পরিধি থেকে সঠিক জবাব না পেয়ে তিনি এই ধারা থেকে সরে আসেন।
খৃস্টের জন্মের ৯৮০ বছর পর আধুনিক উজবেকিস্তানের বুখারায় জন্ম হয় তার। গ্রামের নাম আফশোনা। ইবনে সিনার পুরো নাম আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আল হাসান ইবনে আলী ইবনে সিনা। অর্থাৎ তার পূর্বপুরুষদের একজনের নাম ছিলো সিনা। ইসলামী বিশ্বে ওই নামেই তিনি পরিচিতি পান। তবে পশ্চিমা পণ্ডিতরা তাকে চেনে অ্যাভিসেনা নামে।
এই পণ্ডিতের কাজ ইসলামী বিশ্বে এবং পরে ইউরোপে সুদূরপ্রসারি প্রভাব ফেলেছে। আধুনিক যুগেও তার তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে অনেক কিছু।
ইউরোপিয়রা ইবনে সিনাকে আন্দালুসিয় দার্শনিক ইবনে রুশদ এবং মুসলিম যোদ্ধা সালাউদ্দিন আইয়ুবির সাথে তুলনা করেন। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ধারণাগুলো তিনিই গুছিয়ে এনেছেন। ইসলামি চিন্তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে কাজ করেছেন ইবনে সিনা। তিনি মনে করেন ধর্ম বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তাধারার প্রতিবন্ধক নয়।
ইবনে সিনার যখন জন্ম হয় তখন বাগদাদ-ভিত্তিক আব্বাসিয় খিলাফতে ভাঙন দেখা দেয়। এই অস্থির রাজনৈতিক সময়ও জ্ঞানচর্চায় ভাটা পড়েনি। তখন বাগদাদ ছিলো আলোকিত ও সমৃদ্ধ। ওই সময় ইবনে সিনার পরিবার ছিলো শিয়া ইসলামের ইসমাইলি শাখার অনুসারি। তবে তিনি সুন্নি ইসলামের হানাফি মাযহাব বেছে নেন।
আত্মজীবনীতে ইসমাইলিদের সাথে কথোপকথনের বিষয় উল্লেখ করে ইবনে সিনা জানান, তিনি ইসমাইলিদের কথা শুনতেন। তারা যা বলতো তা বুঝার চেষ্টা করতেন। কিন্তু মন থেকে গ্রহণ করতে পারতেন না।
সেই সময়ের অন্যান্য ইসলামী বুদ্ধিজীবীদের মতো ইবনে সিনার শিক্ষা ছিল গণিত, চিকিৎসা, দর্শনের ওপর। তিনি ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপরও পড়াশুনা করেছেন। মাত্র দশ বছর বয়সে কুরআন মুখস্থ করেন। কৈশোর থেকেই চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান।
ইবনে সিনা ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তরুণ ইবনে সিনার ইসলামি বিদ্যার ওপর দখল ছিলো। এছাড়া তিনি পড়েছেন গ্রিক দর্শন। তিনি মনে করতেন অন্ধ বিশ্বাস নয়, যুক্তিসঙ্গতভাবেই আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখা উচিত। একদিকে যুক্তি, অন্যদিকে বিশ্বাসের মাধ্যমেই তিনি তার জীবন পরিচালিত করেছেন।
কৈশোরে আল জাহিদ নামের এক শিক্ষকের কাছে তিনি ইসলামি ফিকহ পড়াশুনা করেন। তখন ইউক্লিড আর টলেমির লেখাগুলোও পড়ে ফেলেন।
একটু বড় হয়ে তিনি অ্যারিস্টটলের ‘মেটাফিজিক্স’ পড়তে শুরু করেন। এটি ৪০বার পড়ে প্রায় মুখস্ত করে ফেলেন। অর্থ বুঝার জন্য আল ফারাবির লেখা ব্যাখ্যা পড়েন। এরপর দর্শনের ওপর পড়তে শুরু করেন। কোনো বিষয় না বুঝলে ওজু করে মসজিদে নামাজ পড়তেন। অনেক সময় স্বপ্নের ভেতরও সমস্যার সমাধান করতেন তিনি।
১৬ বছর বয়সে চিকিৎসা শাস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আবিষ্কার করতে থাকেন চিকিৎসার নতুন নতুন উপায়। ১৮ বছর বয়সেই তিনি পুরোদমে ডাক্তার।
৯৯৭ সালে আমির নূহ এর ব্যক্তিগত ডাক্তার হিসেবে নিয়োগ পান ইবনে সিনা। নূহ অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা করেন। বিনিময়ে রাজ লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগ পান। একদিন লাইব্রেরিতে আগুন ধরে যায়। শত্রুরা প্রচার করেন ইবনে সিনা-ই আগুন ধরিয়েছেন।
১০০১ সালে ইবনে সিনার বাবার মৃত্যু হয়| ততদিনে মৃত্যু হয় আমির নূহ এর। পরে তার সন্তান ক্ষমতায় বসেন। তিনিও ইবনে সিনার কদর করতেন। কিন্তু নানা রাজনৈতিক ব্যর্থতার পর ইবনে সিনার ওপর বিরক্ত হন।
নিজের সম্মান ধরে রাখতে তিনি বেরিয়ে যান নিরুদ্দেশ-যাত্রায়। এই যাত্রাটা ছিলো রোমাঞ্চকর। কখনো তিনি যাযাবরের মতো ঘুরেছেন। কখনো থাকতে হয়েছে কারাগারে। আবার কখনো রাজার হালে থেকেছেন। সব পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বিদ্যাকে তিনি কাজে লাগিয়েছেন জাদুর মতো।
ইবনে সিনা লিখে গেছেন ‘আল-কানুন ফি আল-তিব’। যাকে বলা যায় ‘দ্য কানুন অফ মেডিসিন’। প্রাচীন ও তার সমসাময়িক চিকিৎসার আবিষ্কারগুলোর সমন্বয় করে তিনি এই বই লিখেন। বইটি ১২ শতকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিলো। ১৭ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এটি রেফারেন্স টেক্সট হিসেবে ব্যবহার হতো।
এতে তিনি সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে ৬০০টিরও বেশি নিরাময়ের বর্ণনা দিয়েছেন। চোখ ও হৃদয়সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ’র বর্ণনা করেছেন। মানুষের শরীরে উদ্ভিদ ও গাছের শেকড়ের প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেছেন।
ছুঁয়াচে রোগের ক্ষেত্রে রোগীকে আলাদা রাখার ধারণাও তিনি দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে ৪০ দিন বিচ্ছিন্ন রাখার কথাও বলেছেন।
চিকিৎসাবিদ্যার বাইরে, তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য বুক অফ হিলিং’। এটি চারভাগে বিভক্ত। এই চারটি ভাগে রয়েছে গণিত, অধিবিদ্যা, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং যুক্তিবিদ্যা।
তিনি আলোর গতি নিয়ে কাজ করেছেন। শব্দ কিভাবে পরিবাহিত হয় সেটার বর্ণনা দিয়েছেন। দিয়েছেন গতির তত্ত্ব। এছাড়া মন ও শরীরের সম্পর্ক নিয়ে নানা মনস্তাত্ত্বিক কাজ করেছেন। প্রাক-আধুনিক মনোরোগবিদ্যায় ছিলো তার পারদর্শিতা। মানুষের শরীরে হতাশা ও উদ্বেগ প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন।
ভূমিকম্প নিয়েও ছিলো ইবনে সিনার আগ্রহ। গবেষণা করেছেন মেঘ কিভাবে গঠন হয় তার ওপর। একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে, ইবনে সিনা সূর্যের বিপরীতে শুক্র গ্রহটিকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন- গ্রহটি সূর্যের চাইতে পৃথিবীর বেশি কাছে। তারার স্থানাঙ্ক নিরীক্ষণের জন্য যন্ত্র আবিষ্কার করেন।
দর্শনে তিনি অ্যারিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যাকে নিজের মতো করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এছাড়া আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা ও যুক্তি ব্যবহার করেছেন| যুক্তিবিদ্যার ওপর লিখেছেন নয়টি বই। এর মধ্যে ‘দ্য বুক অফ হিলিং’-এ যুক্তির উপযোগিতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এই বিষয়ে আগে যারা কাজ করেছেন সেগুলোর ত্রুটি ধরিয়ে দেন। তিনি লিখেছেন, যুক্তির বৈধতা নির্ধারণ এবং জ্ঞানের বিকাশের জন্য যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তির উদ্দেশ্য সত্য প্রতিষ্ঠা করা।
অ্যারিস্টটলের সমালোচনা করে বলেন, মানুষের তিন ধরণের আত্মা আছে- উদ্ভিজ, প্রাণীজ এবং যুক্তিবাদী মানসিকতা। প্রথম দু’টি মানুষকে পৃথিবীতেই বেঁধে রাখে। আর যুক্তিবাদী মানসিকতা মানুষকে আল্লাহর সাথে যুক্ত করে।
আল্লাহর অস্তিত্ব বিষয়ে তিনি লিখেন ‘বুরহান আল-সিদ্দিকীন’। যার অর্থ সত্যবাদীর প্রমাণ| এতে তিনি ব্যাখ্যা করেন একটি অস্তিত্ব অন্য কোনো অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল, যা ওই অস্তিত্বের কারণ। একজন ব্যক্তির নিজের অস্তিত্ব তার বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল। যখন অস্তিত্বশীল সবকিছুর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে। তখন আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করতে হয়।
ইবনে সিনা মানুষের ইন্দ্রিয়গুলোকে বুঝতে চেয়েছেন। তিনি মনে করেন বাহ্যিক ইন্দ্রিয় দৃষ্টি, গন্ধ, শ্রবণ, স্বাদ ও স্পর্শ ছাড়াও মানুষের ভেতর আছে অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয়। তিনি মনে করেন সাধারণ জ্ঞান একটি অভ্যন্তরিণ ইন্দ্রিয়। এই ইন্দ্রিয় বিচার-বিবেচনাকে প্রভাবিত করে। চারপাশের জিনিসগুলো চিনতে সহায়তা করে।
প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাণীদের কি এড়ানো উচিত বা অনুসন্ধান করা উচিত তা নির্ভর করে প্রাণীর কল্পনা শক্তির ওপর। পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে বিচার করার ক্ষমতাকে ইবনে সিনা মনে করেন অনুমানমূলক শক্তি। এই শক্তি দিয়ে কোনটা বিপজ্জনক বা উপকারি সেটা নির্ধারণ করা যায়। অন্যান্য ইন্দ্রিয় থেকে পাওয়া তথ্যগুলো সংরক্ষণ করে স্মৃতি। এটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয় কাজ করে।
১০৩৭ সালের জুন মাসে ৫৮ বছর বয়সে এক যুদ্ধ শিবিরে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ হন। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। ইবনে সিনার মৃত্যুর হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো আধুনিক।