রাত ১১ টায় গেট বন্ধ, বাড়িভাড়া আইন কী বলছে? সংকটের সমাধান কী?

রাত এগারোটা বা বারোটার পর গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। জরুরি প্রয়োজনে ডাকাডাকি করেও নিজের ভাড়া করা বাড়িতে ঢুকতে পারছেন না অনেক ভাড়াটিয়া। রাজধানী ঢাকায় যারা থাকেন, এই দুর্ভোগ তাদের নিয়মিত। নিরাপত্তার অজুহাতে বাড়ির প্রধান গেট বন্ধ করে রাখেন বাড়িওয়ালাদের অনেকে। গেট বন্ধ করে দেওয়ার এই প্রথা কি আইনসম্মত? এই সংকটের সমাধান কী?

বাড়িভাড়া নেওয়া হয় ২৪ ঘণ্টার জন্য। কিন্তু রাত এগারোটা বা বারোটা বাজলেই প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন দারোয়ান। অনেক ক্ষেত্রে দারোয়ান অথবা কেয়ারটেকারকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে গেট খোলাতে হয়। রাজধানী ঢাকায় চলতে থাকা এই প্রথার কারণ হিসেবে বাড়িওয়ালারা দেখাচ্ছেন নিরাপত্তার অজুহাত। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাড়ি পরিচালন খরচ বাঁচাতে এই কৌশল নেওয়া হচ্ছে। একজন মাত্র কেয়ারটেকার দিয়ে দিন ও রাতে প্রহরীর কাজ করানোর কারণেই এই সামাজিক সুরক্ষা সংকট হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে রাত ১১টায় গেট বন্ধ করা বা চলাচলের সময়সীমা নিয়ে স্পষ্ট কোনো কথা বলা নেই। তবে সাধারণ আইনি কাঠামো অনুযায়ী, ভাড়া চুক্তি মানেই ভাড়াটিয়াকে নির্দিষ্ট মেয়াদে ওই বাড়িতে নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবাস ও চলাচলের সুবিধা দেওয়া। অঘোষিতভাবে চলাচলের সুযোগ সীমিত করা সেই চুক্তির পরিপন্থী। এছাড়া জাতীয় বিল্ডিং কোড এবং ফায়ার সার্ভিস বিধিমালা অনুযায়ী বহুতল ভবনের মূল ফটক ও ছাদে যাতায়াত পথ রাতে বন্ধ রাখা গুরুতর নিরাপত্তা অপরাধ। ভূমিকম্প বা আগুন লেগে যাওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার পথ না থাকলে বড় ধরনের জীবনহানির আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশে প্রচলিত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ অনুযায়ী, ভাড়াটিয়াকে যুক্তিসংগত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা বেআইনি। গেট বন্ধ রেখে চলাচলের অধিকার খর্ব করা এবং ছাদ বন্ধ রাখা নাগরিক অধিকার ও চুক্তিগত সুবিধার সরাসরি লঙ্ঘন। অন্যদিকে শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, একজন শ্রমিককে দিয়ে দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করাতে চাইলে অতিরিক্ত ভাতা দেওয়ার বিধান আছে। কম পারিশ্রমিকে ২৪ ঘণ্টার দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া শ্রম আইনের লঙ্ঘন।

এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি বিশেষ নির্দেশিকা রয়েছে। এতে বলা আছে, ভাড়াটিয়ার প্রবেশাধিকার সবসময় সংরক্ষিত থাকবে। সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা নিতে হলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। একই সাথে জরুরি ও আপৎকালীন নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়িওয়ালা শর্তসাপেক্ষে প্রতিটি ভাড়াটিয়াকে মূল ফটক ও ছাদের চাবি সরবরাহ করবেন।

এই সংকট কাটাতে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মূল ফটকে স্মার্ট অ্যাকসেস কার্ড, ডিজিটাল পাসকোড ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা যেতে পারে। এতে কেয়ারটেকারকে না ডেকেই ভাড়াটিয়ারা গেট খুলে যাতায়াত করতে পারবেন। কেয়ারটেকারকে দিয়ে প্রহরীর কাজ না করিয়ে দুই শিফটে পেশাদার নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা যেতে পারে। ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি স্ট্যান্ডার্ড ভাড়া চুক্তিপত্র বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। ভাড়াটিয়াদের সংগঠিত হয়ে অধিকার বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা জরুরি বলেও মনে করা হচ্ছে।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...