
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক আগ্রাসন শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি লাতিন আমেরিকাজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত বহন করে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে ১৮২৩ সালের মনরো নীতির ছায়া টেনে এনেছে- যে নীতি পুরো আমেরিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল।

রাজধানী কারাকাসসহ একাধিক শহরে মার্কিন হামলা এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করার দাবি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন অধ্যায় তৈরি করেছে। এর আগে ভেনেজুয়েলার একটি বন্দরে হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালানের অভিযোগকে সামরিক অভিযানের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে এসব অভিযোগ কারাকাস বরাবরের মতোই প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রশ্ন হলো- সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে একটি সরকারকে উৎখাত করা কি আদৌ কোনো দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে? ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত “রেজিম চেঞ্জ” নীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ইরান থেকে শুরু করে ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা লিবিয়া- কোনোটিই স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি।
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক এডওয়ার্ড এরিকসনের মন্তব্য এই বাস্তবতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি মনে করেন, সরকার পরিবর্তনের রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রায়ই “বড় সমস্যার উৎস” হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেনেজুয়েলাও এর ব্যতিক্রম হবে- এমন নিশ্চয়তা কোথায়?
ভেনেজুয়েলার সরকার রাশিয়া, চীন ও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় এই আগ্রাসন কেবল দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং বহুপাক্ষিক উত্তেজনাও সৃষ্টি করেছে। মস্কো ও তেহরানের কড়া প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয়, ভেনেজুয়েলা সংকট সহজে সীমিত থাকবে না; বরং এটি বড় শক্তিগুলোর পরোক্ষ সংঘর্ষের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, মাদুরো আটক হওয়ার খবরে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্ব ভেঙে পড়েনি। বরং তারা “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের” বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজের বক্তব্যে স্পষ্ট- এই সংঘাতকে সরকার কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। মার্কিন হামলায় সামরিক ও বেসামরিক প্রাণহানির খবর ইতোমধ্যে সামনে এসেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ‘প্রেসিডেন্টের জীবিত থাকার প্রমাণ’ চাওয়ার দাবি পরিস্থিতির ভয়াবহতাই নির্দেশ করে।
পরিশেষে বলা যায়, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ শুধু একটি সরকারকে সরানোর প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত। ইতিহাস যদি কোনো শিক্ষা দিয়ে থাকে, তবে তা হলো- বাহ্যিক শক্তির চাপিয়ে দেওয়া সরকার পরিবর্তন কখনোই টেকসই শান্তি বয়ে আনে না। ভেনেজুয়েলাও সম্ভবত সেই পুরোনো সত্যের আরেকটি উদাহরণ হতে চলেছে।- টিআরটি ওয়ার্ল্ড

মুরাত সফুওগ্লু: তুর্কি সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের স্টাফ রাইটার।