রুনা লায়লার গলায় প্রাচীন সুফি সুর, যা আজো তুফান ডাকে

সংস্কৃতিরঙ3 months ago41 Views

দমাদম মস্ত কালন্দর: এক গানের শতবর্ষী যাত্রা

এমন গান খুব কমই জন্মায়, যা সময়ের বাঁধন ছাড়িয়ে শত শত বছর ধরে আজও সমান জনপ্রিয় থাকে। “দমাদম মস্ত কালন্দর” সেই বিরল সুরের মধ্যে অন্যতম। এটি কেবল একটি গান নয়; এটি আধ্যাত্মিকতা, লোকসংস্কৃতি এবং আধুনিক সঙ্গীতের এক অনন্য মেলবন্ধন।

সাম্প্রতিক সময়ে কোক স্টুডিও বাংলা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে এই গানটির জন্য—এক কিংবদন্তি কণ্ঠের জন্য, রুনা লায়লা। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ার, তিনটি দেশ—বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে সমান জনপ্রিয়তা, অসংখ্য বাংলা, উর্দু ও হিন্দি গান এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—সব মিলিয়ে রুনা লায়লা দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতজগতের এক কিংবদন্তি।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই গান কেবল মুগ্ধ করেই নয়, বরং মানুষের অন্তরের গভীর স্থানেও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। চলুন, দেখি কীভাবে এই সুর যুগে যুগে বেঁচে আছে এবং উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।

গানটির জন্ম

“দমাদম মস্ত কালন্দর” কোনো আধুনিক গান নয়। এর শেকড় অনেক গভীরে—সিন্ধুর সুফি দরবারে, ১৩শ শতাব্দীর দিকে।
এই গান মূলত উৎসর্গ করা হয়েছে এক বিখ্যাত সুফি সাধককে—লাল শাহবাজ কালন্দর। পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে তাঁর মাজারে আজও প্রতিদিন ঢোল, নৃত্য ও কাওয়ালির তালেই উচ্চারিত হয়— “ঝুলে লাল, ঝুলে লাল, মস্ত কালন্দর।” এই ধ্বনিই ছিল গানের প্রথম রূপ—অত্যন্ত সহজ, তালধর্মী, আধ্যাত্মিক ডাক।

ছবি : লাল শাহবাজ কালন্দর এর মাজার। ছবির সূত্র – উইকিমিডিয়া

গানের প্রথম সাহিত্যিক রূপ পাওয়া যায় উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি কবি, দার্শনিক এবং সঙ্গীতজ্ঞ আমির খসরু -র সৃষ্টিতে। তাঁর কাব্য-ধ্বনি, সিন্ধুর লোকসঙ্গীতের সুর আর দরবারের তাল—এগুলো মিলেই গানের বীজ তৈরি করে। এরপর আসে পাঞ্জাবের কবি বাবা বুল্লে শাহ। তিনি যেন গানটিকে হাত ধরে সাধারণ মানুষের উঠোনে নিয়ে যান। তাঁর ভাষায় গানটি আরও পরিচিত আকার পায়।

“দমাদম” শব্দটিও এই সময়ের মধ্যে গানটির দেহে জুড়ে যায়। ঢোলের তালে তৈরি এই শব্দ গানটিকে নাচের মতো প্রাণ দেয়—যাতে শ্রোতা শুধু শোনে না, নড়েও ওঠে।

ফিল্মি ও আধুনিক সংস্করণে জনপ্রিয়তা

২০শ শতাব্দীতে চলচ্চিত্রের জগতে প্রবেশের পর গানটি আরও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পাকিস্তানের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী নূরজাহান প্রথমে এই গানের আধুনিক রূপ গেয়ে এটিকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেন। এরপর উর্দু ফোক ও কাওয়ালি ধারার শিল্পী রেশমা গানটিকে আরও কোমল ও আবেগময় করে তুলেন, যা সাধারণ মানুষের হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়।

পাঞ্জাবের কাওয়ালি ঘরানার মহানায়ক সাবরি ব্রাদার্স এবং পরে আমজাদ সাবরি গানটিকে প্রাণবন্ত কাওয়ালি রূপে উপস্থাপন করেন। প্রতিটি শিল্পীর কণ্ঠে গানটি নতুন মাত্রা পায়—কখনো শক্তিশালী, কখনো মধুর, কখনো উচ্ছ্বাসময়। আধুনিক যুগে বিভিন্ন ব্যান্ড, ডিজে মিক্স এবং কোক স্টুডিও’র ফিউশন সংস্করণগুলোও গানটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

এইভাবে, শত শত বছরের পুরোনো এই সুফি গান প্রাচীন আধ্যাত্মিক ধ্বনি থেকে আধুনিক বিনোদনের অংশে রূপান্তরিত হয়েছে, যা এখনও উপমহাদেশের মানুষের হৃদয়ে সমান জনপ্রিয়।

বাংলাদেশে গানটির যাত্রা

বাংলাদেশে গানটি এসেছে মূলত পাঞ্জাবী ও পাকিস্তানি সুফি ও কাওয়ালি সংস্কৃতি থেকে। স্বাধীনতার আগে ও পরে উর্দু ও হিন্দি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীরা গানটি পরিবেশন করতেন, যা রেডিও, সিনেমা ও লাইভ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষও শুনে পরিচিত হয়ে ওঠে।

১৯৭০-এর পর গানটি ধীরে ধীরে লোকসঙ্গীত ও ব্যান্ড সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের শিল্পীরা—লোকগায়ক ও কাওয়ালি শিল্পীরা—নিজেদের মঞ্চে গানটি পরিবেশন করে নতুন প্রাণ যোগ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে রুনা লায়লা কোক স্টুডিও বাংলায় গানটি গেয়ে আবার নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যান্ড ফিউশন পারফরম্যান্স, কলেজ–মঞ্চ এবং সাংস্কৃতিক উৎসবে গানটি সমানভাবে জনপ্রিয়।

শেষ কথা

“দমাদম মস্ত কালন্দর” এক সাংস্কৃতিক নদীর মতো—যার উৎস সুফি সাধনা, পথ লোকসংগীত, স্রোত সিনেমা, স্টেজ আর আধুনিক সংগীত। আজ রুনা লায়লা সেই নদীকে নতুন স্রোতে বয়ে আনলেন। গানটি প্রমাণ করে—সংস্কৃতি কখনো থেমে থাকে না; এটি শুধু নতুন রূপে বাঁচতে থাকে।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...