জার্নালিজম রিভিউ

নিরপেক্ষ হওয়া যেহেতু একটি অসাধ্য ব্যাপার তাহলে অন্তত সত্যের পক্ষে থেকে নিরপেক্ষতা হারান


একটা সময় ছিল, একটি সংবাদপত্র অন্য সংবাদপত্রের কোনো সমালোচনা করত না। এর পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলা হলো- ‘কাকের গোশত কাকে খায় না’। বর্তমানে সেই অবস্থাটি আর নেই। এক পত্রিকা অন্য পত্রিকাকে রীতিমতো তুলোধুনো করছে। তবে এসব সমালোচনার বেশিরভাগই আক্রমণাত্মক, গঠনমূলক নয়। ভুল ধরিয়ে দেয়ার জন্য নয়, নাজেহাল করার জন্য। এসব সমালোচনায় প্রায়ই রাজনৈতিক মেরুকরণকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ফলে এসব সমালোচনাকে পাঠকরা পক্ষপাতদুষ্ট বলেই ধরে নেয়।
সংবাদপত্রে কি বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর বা কলাম ছাপা হয় না? হয়।

সরদার ফরিদ আহমদ

তাহলে? হ্যাঁ তাহলে পত্রিকার সমালোচনা করার অধিকার নিশ্চয় থাকা উচিত। আমেরিকায় জার্নালিজম রিভিউ ধরনের পত্র-পত্রিকা আছে। সেখানে কিছু দৈনিক পত্রিকাও আছে যারা মিডিয়ার নানা ধরনের সমালোচনা এবং কর্মকাণ্ড নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে চলেছে। বাংলাদেশে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রথম এ ধরনের লেখা ছাপে এবং জনপ্রিয়তা পায়। দু’তিনটি এনজিও এ ধরনের কাজ করছে। তবে বলতে দ্বিধা নেই- এসব এনজিও সাংবাদিকতার মান উন্নয়নের জন্য এ কাজটি যতটা না করে, তার চেয়ে বেশি করে ফান্ডিংয়ের জন্য।
আচ্ছা সাংবাদিকরা কি ভুল করেন না? করেন। তারাও তো মানুষ। মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারেন। এসব ভুল নিয়ে মজার মজার ঘটনা আছে। তাছাড়া ছাপাখানার ভূতের খপ্পরে পড়ে কত যে উল্টাপাল্টা ঘটনা ঘটে তার ইয়ত্তা নেই। আজ না হয় সেসবেরই কিছু পুনরাবৃত্তি করা যাক। এগুলো অনেকেরই জানা। তবে মজার বিষয় রিপিট করতে তেমন দোষ নেই।
ডিগ্রিতে ইংরেজি উঠিয়ে দেয়ার মতো বালখিল্যতা এদেশে একবার করা হয়েছিল। ফলে ইংরেজি অনেকের জন্যই রীতিমতো হিব্রু ভাষায় পরিণত হয়েছিল। দৈনিক পত্রিকায় চাকরি নিয়ে ইংরেজি থেকে বাংলায় সংবাদ করতে গিয়ে অনেক সাব-এডিটর মজার মজার কাণ্ড করেছেন। ‘পুলিশ ওয়াজ পেট্রোলিং অন দ্য স্ট্রিট’- এই বাক্যটির অনুবাদ করতে গিয়ে এক সাব-এডিটর লিখেছিলেন- ‘পুলিশ রাস্তায় পেট্রোল ছিটাচ্ছিল’। শুদ্ধ অনুবাদটি হলো- ‘পুলিশ রাস্তায় টহল দিচ্ছিল’। আরেকটি ইংরেজি বাক্যের অনুবাদ করতে গিয়ে কী করা হয়েছিল দেখুন। ‘এট দ্য টাইম অব এক্সপ্লোশন হি ওয়াজ এওয়ে ফ্রম হোম’- একজন সাব-এডিটর এটির অনুবাদ করেছিলেন ‘বিস্ফোরণের সময় তিনি বাড়ির বাইরে ছিলেন’। শুদ্ধ অনুবাদটি হবে- ‘বোমা বিস্ফোরণের সময় তিনি দৌড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন’।
নতুন সাব-এডিটর হিসেবে পত্রিকায় যোগ দিয়েছেন এক তরুণ। শিফ্ট-ইন-চার্জ বললেন, দেখ, আমাদের পত্রিকায় কিন্তু ‘শ্রী’ লেখা হয় না। লিখতে হবে ‘জনাব’। ওই সাব-এডিটর শ্রীলঙ্কার অনুবাদ করে বসলেন ‘জনাব লঙ্কা’। বুঝুন অবস্থা। একজন গেন্ডারিয়ার ইংরেজি উচ্চারণ লিখেছিলেন ‘গনদরিয়া’। একবার এক সাব-এডিটর অনুবাদ করতে গিয়ে ‘রুশ পতিতায় ইউরোপের পতিতালয়গুলো ভরে গেছে’ না লিখে লিখেছিলেন, ‘রুশ পতিতায় ইউরোপের ব্রোথেলনগরী ভরে গেছে’।
রেললাইনের জোড়া দেয়ার লোহাটাকে ফিশ প্লেট বলা হয়। ফিশ প্লেট ভেঙে যাওয়ায় ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ে। এক সাব-এডিটর বাসস-এর ইংরেজি কপি অনুবাদ করে লিখলেন, ‘রেললাইনের ওপরে রাখা মাছের প্লেট ভেঙে পড়ায় ট্রেনটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়’।
এ ব্যাপারে রিপোর্টাররাও কম যান না। ট্রাকের নিচে পড়ে সলিল সমাধি, লাশ দুটি মর্গে ভর্তি করা হয়েছে, গরম পানিতে পড়ে অগ্নিদগ্ধ- এই ধরনের বাক্য আমাদের দেশে লেখা হয়েছে। ভাগ্যিস ছাপা হয়নি। হলে ‘জাতির বিবেক’দের অবস্থা কেমন হতো একবার ভাবুন তো।
ছাপার ভুলে কী ধরনের ভয়াবহ ঘটনা যে ঘটে তা ভাবলে আতঙ্কিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমাদের এক বান্ধবী খেলাধুলা করত এবং লেখালেখির সাথেও জড়িত ছিল। ও একবার লিখল, ‘ওমুক (মহিলা) অ্যাথলেট ভারতের পাতিয়ালা থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন।’ পরের দিন ছাপা হলো- ‘ওমুক (মহিলা) অ্যাথলেট ভারতের পতিতালয় থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন’। আমাদের ওই বান্ধবীর অবস্থা তো কাহিল। ও খেলাধুলা তো ছেড়েছেই, লেখালেখিও বন্ধ। জার্নালিজমে অনার্স-মাস্টার্স করেও ও এখন ফুলটাইম গৃহিণী। বুঝুন ছাপাখানার ভূত কেমন ভোগায়। ইন্টারনেটের যুগে এসে বিষয়টি বোধহয় এতো সরলীকরণ করে দেখার সুযোগ নেই। কোন পত্রিকা কোন বিষয়ে কোন পক্ষে লিখবে তা পাঠকরা আগেভাগেই ধরে নেন। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো রাজনৈতিক মেরুকরণকে সামনে রেখেই যে সংবাদ পরিবেশন করে এটি এখন পুরনো গল্প। সবারই জানা। এ কারণেই দেখা যায়, একটি পত্রিকা লিখছে, ‘র‌্যাবের কারণে স্বস্তির সুবাতাস বইছে’। একই দিন অন্য পত্রিকা প্রথম পাতার চার কলামে বক্স করে নিউজ ছাপলো ‘র‌্যাব চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে’। কিছু পত্রিকা লিখল ‘দেশের উত্তরাঞ্চলের মঙ্গায় মানুষের করুণ দশা’। ওইদিনই হয়তো আরেক পত্রিকা পাকা ধান ক্ষেতের বিশাল ছবি ছাপিয়ে সংবাদ পরিবেশন করল ‘উত্তরাঞ্চলে আমন ধানের বাম্পার ফলন, কৃষকের মুখে হাসি, দরিদ্ররা কাজ পেয়ে খুশি, মঙ্গা এখন বাসি’।
পাঠকরা ধরেই নেন, র‌্যাবের বিপক্ষে যারা, মঙ্গা নিয়ে মাতামাতি করছেন যারা- তারা জোট সরকারের বিরোধী। অন্যদিকে যেসব পত্রিকা র‌্যাবের পক্ষে এবং আমনের বাম্পার ফলনের খবর দিচ্ছে- তারা সরকারের সমর্থক। ফলে এই ধরনের নিউজের কোনোটিকেই সচেতন পাঠক গুরুত্ব দেন না, বিশ্বাস করেন না।
এর মানে কি পাঠক সংবাদ পড়ে বিভ্রান্ত হন না? হ্যাঁ, হন। কখন কীভাবে? ধরুন, এক জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটল। এক পত্রিকা লিখল, এতে নিহত হয়েছে ২০ জন, আহত ৫০। আরেক পত্রিকা লিখল, নিহত ২৭, আহত ৮০। অন্য এক পত্রিকা লিখল, হতাহতের সংখ্যা ২৮। তথ্যের এই চূড়ান্ত গরমিলে পাঠকরা বিভ্রান্তিতে পড়তে বাধ্য। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও বিক্ষোভ দেখাতে পারেন না। কারণ সব পত্রিকার যে একই অবস্থা।
বলতে পারেন, তাহলে জনগণ কেন পত্রিকা পড়ে? জবাব একটাই। স্বভাবের কারণে। পত্রিকা না পড়লে ভালো লাগে না, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে। কী যেন হারালাম, এমন একটি ভাব মনে এসে গেড়ে বসে। আসলে অভ্যাস। তবে স্বস্তির কথা যে, আমাদের দেশে যারা পত্রিকা পড়েন না তারাই ম্যাজরিটি-সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর মানে হলো পত্রিকার পাঠকরা মাইনরিটি। মাইনরিটিরা বেশি সচেতন- এই কথা ভেবে পত্রিকার পাঠকরা আত্মশ্লাঘা বোধ করতে পারেন।
পত্রিকাগুলো যতোই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অথবা র‌্যাবয়িক মেরুকরণ করুক না কেন একটা বিষয়ে কিন্তু কিছুই করতে পারে না। খেলার খবর পরিবেশনায় ফলাফলটি ঠিক মতোই দিতে হয়। খেলার হারজিতটাই আসল। কী কারণে হারল-কীভাবে জিতল এসব পরের কথা। এর মানে আমরা বলতে পারি, খেলার খবর নিরপেক্ষ। হ্যাঁ, খবরটি নিরপেক্ষই হয়- তবে যিনি লিখেন তিনি যে পক্ষপাতদুষ্ট হবেন না এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তো অনেক আগেই বলেছেন, পাগল এবং শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। সাংবাদিকরা যেহেতু এই দুই প্রজাতির কোনোটিই নন তাহলে নিরপেক্ষ হবেন কী করে? নিরপেক্ষ হওয়া যেহেতু একটি অসাধ্য ব্যাপার তাহলে অন্তত সত্যের পক্ষে থেকে নিরপেক্ষতা হারান- এই অনুরোধটুকু পাঠকরা সাংবাদিকদের করতেই পারেন।

সরদার ফরিদ আহমদ: সিনিয়র সাংবাদিক। তাঁর বই ‘প্রেস প্যাকেজ’ থেকে লেখাটা নেওয়া হয়েছে। বইটি প্রকাশ হয়েছে ২০০৬ সালে।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...