
বাংলাদেশে খেলাধুলার কথা উঠলেই সবার আগে আসে ক্রিকেট আর ফুটবলের নাম। তবে সময়ের সাথে সাথে দুনিয়ার নানা প্রান্তে নতুন কিছু খেলা জন্ম নিচ্ছে, জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং অল্প সময়েই মানুষের জীবনযাপনের অংশ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক এমনই এক খেলা হলো পিকলবল। নামটা শুনতে একটু অচেনা মনে হলেও খেলার ভেতরে আছে টেনিস, ব্যাডমিন্টন আর টেবিল টেনিসের মিশ্র স্বাদ। এ কারণেই অল্প কিছু বছরের মধ্যে পিকলবল ছড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা থেকে ইউরোপ, এমনকি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।
পিকলবল মূলত একটি রেকেট খেলা। ছোট আকারের একটি কোর্টে জালের দুই পাশে দুইজন বা চারজন খেলোয়াড় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খেলেন। খেলায় ব্যবহৃত হয় একটি হালকা প্লাস্টিকের বল, যার গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। খেলোয়াড়রা কাঠ বা ফাইবার দিয়ে তৈরি চ্যাপ্টা ধরনের রেকেট ব্যবহার করে বলকে জালের ওপরে পাঠায়। নিয়ম অনেকটাই টেনিসের মতো, তবে শেখা অনেক সহজ। পিকলবলে রেকেটকে প্যাডেল বলা হয়। কোর্টের আয়তন সাধারণ টেনিস কোর্টের অর্ধেক। ফলে খেলার জন্য খুব বেশি জায়গা লাগে না। খেলার নিয়মও সহজ হওয়ায় ছোট শিশু থেকে প্রবীণ বয়সের মানুষ সবার কাছেই খেলা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পিকলবলের জন্ম হয় ১৯৬৫ সালে আমেরিকার ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে। গ্রীষ্মের ছুটিতে তিন বন্ধু—জোয়েল প্রিচার্ড, বার্নি ম্যাককলাম এবং বিল বেল—পরিবারের শিশুদের বিনোদনের জন্য নতুন একটি খেলার আয়োজন করেন। তারা প্রথমে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট ব্যবহার করেন, জাল নিচু করে দেন, বল হিসেবে নেন ছিদ্রওয়ালা হালকা প্লাস্টিকের বল আর প্যাডেল বানান কাঠ দিয়ে। মজার বিষয় হলো, এই সাধারণ উদ্যোগই আজ কোটি মানুষের প্রিয় খেলায় পরিণত হয়েছে।
১৯৮৪ সালে গঠিত হয় প্রথম জাতীয় সংগঠন, যেটি পরবর্তীতে “যুক্তরাষ্ট্র পিকলবল সংস্থা” নামে পরিচিতি পায়। সেই সময় থেকে নিয়মকানুন সাজানো হয়, টুর্নামেন্ট শুরু হয় এবং খেলাটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে থাকে।
সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী সেখানে প্রায় দুই কোটি মানুষ নিয়মিত বা মাঝে মাঝে পিকলবল খেলে। গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে এটি সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল খেলা হিসেবে স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, অনেক শহরে নতুন কোর্ট তৈরি হচ্ছে, এমনকি স্কুল-কলেজেও খেলা শেখানো শুরু হয়েছে।
কানাডায়ও খেলাটি দ্রুত ছড়াচ্ছে। ২০২৩ সালে সাড়ে তেরো লাখ মানুষ অন্তত মাসে একবার পিকলবল খেলেছে বলে জরিপে জানা যায়। অস্ট্রেলিয়ায়ও রেজিস্ট্রারভুক্ত খেলোয়াড়ের সংখ্যা কুড়ি হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং সেখানে প্রায় তিনশর মতো ক্লাব সক্রিয়ভাবে পিকলবল আয়োজন করছে।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীনে এই খেলা জাতীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভারতের শহরগুলোতেও কর্পোরেট লিগ ও বিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পাচ্ছে পিকলবল। বাংলাদেশে এখনও তেমন ছড়ায়নি, তবে সম্ভাবনা অনেক। কারণ জায়গা কম লাগে, খরচ কম এবং সব বয়সের মানুষ খেলতে পারে।
বিশ্বজুড়ে পিকলবল এর সরঞ্জামাদির বাজারের আয়তন ২০২৩ সালে ছিল দেড় বিলিয়ন ডলারের মতো, যা ২০৩৩ সালে চার বিলিয়নের বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সহজ নিয়ম : নতুন খেলোয়াড়ও কয়েক মিনিটের মধ্যেই খেলা শিখে ফেলতে পারে।
ছোট কোর্ট : টেনিস কোর্টের অর্ধেক জায়গায় খেলা যায়। শহরে যেখানে জায়গা কম, সেখানে এটি বড় সুবিধা।
সব বয়সের উপযোগী : শিশু, তরুণ, প্রবীণ—সবাই খেলার আনন্দ পায়।
সামাজিক মিলনমেলা : পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশী সবাই মিলে খেলতে পারে।
শারীরিক সুস্থতা : নিয়মিত খেলা শরীরচর্চার মতো কাজ করে। হৃদযন্ত্র ও শরীরকে সক্রিয় রাখে।
অর্থনৈতিক দিক : সরঞ্জাম সস্তা, কোর্ট বানাতে বেশি খরচ লাগে না। ফলে সাধারণ মানুষও সহজে অংশ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিকলবল আগামী দশকে আরও ছড়িয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন এটি সামাজিক খেলায় পরিণত হয়েছে, তেমনই কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারতসহ অনেক দেশে সরকারি উদ্যোগে কোর্ট তৈরি ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলছে।
অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সেটি এখনই বাস্তবায়ন হয়নি, তবে বিশ্বব্যাপী যেভাবে খেলার সম্প্রসারণ হচ্ছে, তাতে একদিন হয়তো পিকলবল অলিম্পিকের নতুন ইভেন্ট হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে এখনও নতুন হলেও এ খেলার বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। শহরের স্কুল, কলেজ কিংবা ক্লাবগুলো চাইলে সহজেই ছোট একটি কোর্ট তৈরি করতে পারে। ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো বড় মাঠের দরকার নেই, ফলে খরচও কম। তরুণদের বিনোদনের নতুন বিকল্প হিসেবে পিকলবল দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
যদি সঠিক উদ্যোগ নেয়া যায়, তবে খুব শিগগিরই দেশের বিভিন্ন পার্ক, বিদ্যালয় ও ক্লাব মাঠে দেখা যাবে রঙিন প্লাস্টিকের বল উড়ে যাচ্ছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
পিকলবল শুধুমাত্র একটি খেলা নয়, বরং সামাজিক সম্পর্ক, বিনোদন এবং শারীরিক সুস্থতার দারুণ সমন্বয়। অল্প সময়ে শেখা যায়, ছোট জায়গায় খেলা যায় এবং সবচেয়ে বড় কথা—সব বয়সের মানুষ এতে আনন্দ খুঁজে পায়। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ইতোমধ্যে এর সাথে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে যদি উদ্যোগ নেয়া হয়, তাহলে হয়তো অচিরেই ক্রিকেট-ফুটবলের ভিড়ে জায়গা করে নেবে এই নতুন খেলা—পিকলবল।