অবাক জোছনা: ড. সুরাইয়া ইয়াসমীন হীরা

গল্প1 month ago30 Views

নৌকা চলছে বড়াল নদীর মাঝ দিয়ে। জোছনার আলো চারপাশে ছড়িয়ে গেছে...

পদ্মার উত্তরে একটাই শাখানদী, নাম বড়াল। আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে নদীতে পানি ভালোই ছিলো। নৌকা চলতো। নদীতে গোসল করতে আসতো মানুষ। আড়ানী স্টেশনের পাশ দিয়ে চলে গেছে যে পথ, নদীর ধার দিয়ে, সেপথ দিয়ে আব্বা, আম্মা, ভাইয়া ও ছোট আপুর সাথে হেঁটে যাচ্ছে বর্ষা। কি আনন্দ তার মনে! অনেকদিন পর দাদাবাড়ি যাচ্ছে তারা। ছোটচাচার বিয়ে! দাদাবাড়িতে সবাই আসবে- বড় ফুপু, মেঝ ফুপু, ছোট ফুপু, ফুপাতো ভাই বোনেরা। চাচা-চাচী, চাচাতো ভাই বোনেরা। সবাই মিলে মজা হবে।
ভাবতেই মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। বর্ষার বড় ভাই আকাশ হেঁটে তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে। বৃষ্টি আপুও চলে যাচ্ছে হেঁটে। বর্ষা পেছনে পড়ে যাচ্ছে বারবার। আম্মা বলছেন, সাবধানে পথ চল বর্ষা। পড়ে যাবি।

পাকা গ্রামের লোকজন সব চলে এসেছে আব্বাকে দেখতে। আব্বা তাদের খুবই প্রিয় মানুষ। আব্বাকে সবাই বড় ভালো জানেন। বর্ষা এক দৌড়ে পৌঁছে গেলো পাকা স্কুলের কাছে। স্কুল পার হয়ে সামনে এগুলে বিরাট এক বটগাছ। কি সুন্দর ছায়া দেয়! হাতের বাদিকে নদী, আর ডানদিকে হিন্দুপাড়া। দুর্গাপূজার সময় এখানে উৎসব হয়। কতো রঙ- বেরঙের হাঁড়ি-পাতিল-কলসি পাওয়া যায়। কতোরকম মোয়া, নাড়ু, মুড়ি, মুড়কী আর খাবার।
বাঁশি-বেলুন সবই পাওয়া যায়। বর্ষার খুব ভালো লাগে। বর্ষার বোন বৃষ্টি শখের হাঁড়ি কিনে নিয়ে যায় এখান থেকে। তার আবার রঙিন হাঁড়ি সাজিয়ে শিকাতে ঝুলিয়ে রাখার শখ।

বড় সৌখিন মানুষ বৃষ্টি। বড় আপা ও মেঝ আপা খুব ভালো ছাত্রী। পড়াশোনা কাজকর্ম করে অনেক। আর মানুষ হিসেবেও ভালো। ধর্ম-কর্ম করে মন দিয়ে, যাতে দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তি ও মুক্তি পাওয়া যায়। ছোট আপা মানে বৃষ্টি আপাও খুব ভালো। বড় সৌখিন সে। কষ্ট হলেও দাদাবাড়ি থেকে টেনে মাটির রঙিন হাঁড়ি নিয়ে যাবে সে। সাজিয়ে রাখবে আর সবাইকে দেখাবে। বলবে- জানো, এগুলো আমার দাদাবাডড়ির মেলা থেকে আনা। ছোট আপা ধৈর্য্যশীল ও সহনশীল। বর্ষা দুষ্টুমি করলে কেউ বকা দিলে ছোট আপাই বুঝিয়ে সবাইকে শান্ত করে। বাড়ির ছোট বলে বর্ষাকে বকা খেতে হয় বেশি। আবার ছোট বলে সবাই আদরও করে বেশি।

দাদাবাড়িতে বিয়ের আমেজ। ছোট চাচার বিয়ের জমজমাট আয়োজন চলছে। ছোট ছোট ভাই-বোনরা মানে বর্ষার কাজিনরা রঙ-বেরঙের কাগজ কেটে ফুল বানাচ্ছে ঘর সাজানোর জন্য। ভারী সুন্দর! বর্ষার চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে দেখে। ফুপুরা সব পিঠা বানাচ্ছেন চুলার পাশে বসে। চাচীরাও আছে সাথে। আম্মা গিয়ে যোগ দিলেন তাদের সবার সাথে। তৈরি হতে থাকলো পিঠা। সেসব পিঠা দেখতে যেমন সুন্দর খেতেও সুস্বাদু!

দাদাবাড়ির সাথেই যে আমবাগান আছে, সেটা সবার বড় প্রিয়। সেখানে খেলা করা যায় সবাই মিলে। এতো সুন্দর ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশ চারদিক। চোখ জুড়িয়ে যায়। বড় বড় আমগাছগুলোর পাশে আছে কাঁঠাল গাছ। ইয়া বড় বড় কাঁঠাল হয় গাছে। আর ফজলি আমের গাছের আমগুলো যখন ধরে থাকে, চোখ সরানো যায় না। এতো বড় বড় আম ধরে, এতো মজা আর এতো মিষ্টি, বলে বুঝানো কঠিন। বাড়ির একটা ঘরে আমগুলো পালা দেওয়া হয়। একঘর ভর্তি আম। যারা দেখেনি তারা আসলে বুঝতেও পারবে না ব্যাপারটা। কোনো বাধা নেই। মনের আনন্দে সবাই আম খেতো। আমের আমতা দিতো চাচী। বড় পাটিতে আম সেদ্ধ করে দেওয়া হতো সেই আমতা। শুকিয়ে গেলে রোল করে সংরক্ষণ করা হতো বছরধরে খাওয়ার জন্য। আমতা খেতে অমৃত!ভাবলেই জিভে জল এসে যায়।

কাঁঠাল গাছে উঠে বর্ষা একটা ডালে শুয়ে শুয়ে নদী দেখতো। বড়াল নদীটা এতো কাছে! বর্ষার সাথে থাকতো ফুপাতো বোন বন্যা। খুব ভাব তাদের। বোনের সাথে হা হা হি হি গল্প করতে করতে নদীটা দেখতে কি যে ভালো লাগতো!
কাজিনরা মিলে আলোচনা শুরু হলো- চাচার গায়ে হলুদ, বিয়ে ও বৌভাতে কি কি মজা করবে সবাই।

রাতে চাঁদ উঠলো আকাশে। চারপাশটা জোছনায় ভরে গেলো। এতো সুন্দর চাঁদনী রাতে বড়াল নদীতে নৌকা ভ্রমণ করলে কেমন হয়? সবাই আনন্দে মেতে উঠলো শুনে। কিন্তু বাড়ির বড়োরা কি ছোটদেরকে রাতে নৌকাভ্রমণের অনুমতি দেবে? মোটেই না। তাহলে কি করে সম্ভব? ছোটরা বললো, দেখো এতো জোছনায় নৌকাভ্রমণ করতে হলে একটু তো বকা খেতেই হবে। বড়রা বকা দিলে সবাই চুপ করে থাকবি। এক কান দিয়ে শুনবি আর আরেক কান দিয়ে বের করে দিবি। শুনে সবাই হাসাহাসি করলো আর সবাই রাজি হয়েও গেলো।

বিয়ে বাড়ি হৈচৈ। সবাই অনেক কাজ নিয়ে আছে। বর্ষা, বন্যা, বৃষ্টি, সবুজ, হৃদয়, নিলয়সহ আরও কাজিনরা একসাথে হয়ে রাতে আস্তে আস্তে নদীর ঘাটে গেলো। মাঝি চাচা একসাথে এতো ছেলেমেয়ে দেখে অবাক! কী খবর? বিয়েবাড়ি ছেড়ে সবাই নদীর ঘাটে কেন? জোছনা রাতে নৌকায় ঘুরতে মন চায়? তোমাদের বাপ-মা বকলে কিন্তু আমাকে দোষ দিও না। সবাই মিলে মাঝি চাচাকে ম্যানেজ করে নৌকায় উঠলো।

নৌকা চলছে বড়াল নদীর মাঝ দিয়ে। জোছনার আলো চারপাশে ছড়িয়ে গেছে। অবাক হয়ে সবাই চুপ করে বসে আছে। এমন অপরূপ জোছনা কোনোদিন দেখেনি বর্ষা এর আগে। এতো জোছনা পানিতে পড়েছে, না দেখলে তার রূপ বলে বুঝানো যাবে না। কেউ কোনো কথা বলতে পারছে না। মুগ্ধ হয়ে দেখছে। অনেকটা সময় ধরে নৌকায় করে সবাই জোছনা দেখলো। এই ভালো লাগার যেন কোনো শেষ নেই।

হঠাৎ দেখে চাচাসহ বড়রা খুঁজতে খুঁজতে নদীর ঘাটে চলে এসেছে। বাড়ির এতোগুলো বাচ্চা, একসাথে উধাও। চিন্তা তো সবার হবেই। সবাই মিলে নদীর ঘাটে এসে বকাবকি শুরু করলো। সবাই চুপ করে বকা শুনলো। কোনো কথা বললো না। কারণ আগেই বলা ছিলো- বকা দিলে এক কান দিয়ে শুনবে, আরেক কান দিয়ে বের করে দেবো। এতো সুন্দর জোছনার আলো উপভোগ করতে হলে এটুকু তো সহ্য করতেই হবে।

সেই ছোটবেলা থেকেই বর্ষার ইচ্ছে, আবার কোনো একদিন নদীতে জোছনা দেখবে। কিন্তু ছোট থেকে বড় হয়ে গেছে বর্ষা। আর কোনোদিন এভাবে জোছনা দেখা হয়নি। দাদাবাড়ির জোছনা দেখার স্মৃতি তাই আজও অমলিন।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...