জেরুজালেম বিজয়ী সুলতান সালাহউদ্দীন: অবিশ্বাস্য মানবতার ইতিহাস!

জেরুজালেম বিজয়ী সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবি। যার জীবনের সবটা একসাথে করলে দাঁড়িয়ে যায় রোমাঞ্চকর গল্প। একদিকে তিনি লড়াই করেছেন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে সামাল দিয়েছেন নিজ ধর্মের ষড়যন্ত্রকারীদের। তারপর তৈরি করেছেন মুসলমানদের শক্তিশালী ভীত। ক্রসেডারদের কবল থেকে উদ্ধার করেছেন বায়তুল মুকাদ্দাস। জেরুজালেম বিজয়ের সেই ইতিহাস লেখা আছে সোনার অক্ষরে। পশ্চিমা ইতিহাসবিদরাও লিখে গেছেন তার অভূতপূর্ব মানবতার কথা। চ্যাম্পিয়ন অব হিউম্যান রাইটস সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবিকে নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

Sultan Saladin showing mercy to a caravan of civilians leaving Jerusalem.
জেরুজালেমে একটি শান্তিপূর্ণ আত্মসমর্পন ঘটে

জেরুজালেম জয় করার পর মানবতার নজির তৈরি করেছিলেন হজরত ওমর (রা.)। এর ৪৬২ বছর পর শহরটির নিয়ন্ত্রণ হারায় মুসলমানরা। ১০৯৯ সালে নামধারী মুসলিমদের সহায়তার বাইতুল মুকাদ্দাস কেড়ে নেয় খৃস্টান ক্রুসেডাররা| এর পর সেখানে শুরু হয় নৃশংসতার উল্লাস। জেরুজালেমের মাটি লাল হয় সাধারণ মুসলমানের রক্তে। এক ইতিহাসবিদ লিখেছেন, ওই সময় মুসলিমদের রক্তের নদীতে সাঁতার কেটেছে ক্রুসেডারদের ঘোড়া।
এই পরাজয়ের পর জেরুজালেমে মুসলমানরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তারা অপেক্ষায় থাকে কোনো এক নেতা আসবে বলে| যে নেতা তাদের ফিরিয়ে দেবে হারানো গৌরব। জেরুজালেমে ফিরে আসবে মানবতা।
প্রথম ক্রুসেডের আট দশক পর এমন এক নেতার আবির্ভাব হয়। তিনি সালাহউদ্দীন আইয়ুবি, উদ্ধার করেন বাইতুল মুকাদ্দাস। ওই জয়ের পর আইয়ুবি অনুসরণ করেন হজরত ওমর (রা.) এর মানবতার নজির।
সালাহউদ্দীন কেবল একজন সৈনিক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না। ছিলেন বীর। সহনশীলতা, ন্যায়বিচার ও মানবতার জন্য তাকে স্মরণ করে বিশ্ব।

তিনি ছিলেন দুই পবিত্র মসজিদের রক্ষক। তার সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল মিশর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, হেজাজ, ইয়েমেন এবং উত্তর আফ্রিকার কিছু এলাকা। পশ্চিমা বিশ্ব তাকে চেনে সালাদিন নামে| তবে তার নাম ছিলো ইউসুফ। জন্ম তিকরিতের একটি কুর্দি পরিবারে। তিকরিত আধুনিক ইরাকের অংশ। তখন ছিলো মেসোপটেমিয়ায়।
ইউসুফের জন্মের সাল ১১৩৭ ছিলো বলেই ধারণা করা হয়। তার জন্মও হয় পারিবারিক এক অস্থিতিশীল সময়ে।
জন্মের পাঁচ বছর আগে মসুলের শাসক ইমাদুদ্দিন জঙ্গি এক যুদ্ধ থেকে পালিয়ে টাইগ্রিস নদীর কাছে যান| ওই নদীর উল্টো পাশে তিকরিতে একটি দুর্গ ছিলো। এর রক্ষক ছিলেন ইউসুফের বাবা নাজমুদ্দিন আইয়ুব| তিনি ইমাদুদ্দিন জঙ্গিকে নৌকা দিয়ে নদী পার করে নিয়ে আসেন। আশ্রয় দেন দুর্গে।

পরে এ ঘটনা জানতে পারে শত্রুপক্ষ। উত্তর মেসোপটেমিয়ার সামরিক গভর্নর মুজাহিদউদ্দিন বিহরুজ আইয়ুব পরিবারকে তিকরিত থেকে বহিষ্কার করেন। রাতের অন্ধকারে পরিবার নিয়ে শহর ছেড়ে যাচ্ছিলেন নাজিমুদ্দিন আইয়ুব| ওই রাতেই জন্ম হয় ইউসুফ, তথা জেরুজালেম বিজয়ী বীর সালাহউদ্দীন আইয়ুবির।

ছেলের জন্মের পরপরই সুখবর পান বাবা। মসুল থেকে বার্তা পাঠিয়েছেন ইমাদুদ্দিন জঙ্গি। তিনি মসুলে একটি দুর্গের কমান্ডার বানিয়ে দিলেন ইউসুফের বাবাকে।

ওই ঘটনার নয় বছর পর ইমাদউদ্দিন জঙ্গির মৃত্যু হয়। মসনদে বসেন তার ছেলে নুরউদ্দিন জঙ্গি। যিনি হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে স্বপ্নে দেখেছিলেন। এবং ইহুদি ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে রক্ষা করেছিলেন পবিত্র রওজা মুবারক। অন্য একটি প্রতিবেদনে সে তথ্য তুলো আনার ইচ্ছা রইলো।

নুরউদ্দিন জঙ্গির সময় সালাহউদ্দীনরা থাকতেন দামেস্ক। ওখানে পড়ালেখার দিকে মন দিয়েছিলেন তিনি। ইতিহাসের ওপর ছিলো প্রবল ঝোঁক। এছাড়া ইসলামিক শিক্ষাও নেন। সেনাবাহিনীতে কাজ করার ইচ্ছা তখন ছিলো না।

তবে তার চাচা আসাদুদ্দিন শেরকোহ তাকে অস্ত্র চালাতে সেখান| এবং তার সাথে লড়াইয়ের মাঠেও যেতে বাধ্য হন| তিনি লড়াই করেন নুরুদ্দীন জঙ্গির হয়ে। ১৯৬৯ সালে মিসরিয় ফাতেমীয় খিলাফা আল আদিদের উজির সঙ্কটের মুখে পড়েন| ওই সময় খলিফাদের চাইতে উজিরের ক্ষমতা ছিলো বেশি। আল আদিদের উজির শাওয়ারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেন বনু রুজাইক গোত্রের দিরগাম। এ কারণে শাওয়ার নুরুদ্দিন জঙ্গির সহযোগিতা চান। তিনি আসাদউদ্দিন শেরকোকে মিশরে পাঠান। সঙ্গে তার ভাতিজা সালাহউদ্দীন আইয়ুবি। দিরগামকে পরাজিত করে শাওয়ারকে আবার ক্ষমতায় বসান তারা।

পরের ঘটনা নাটকীয়| শিরকো ও শাওয়ারের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই সময়ের মধ্যেই শাওয়ারের মৃত্যু হয়| এর আরও পরে ১১৬৯ সালে ৩১ বছর বয়সে মিশরে ফাতেমীয় খিলাফতের উজির হিসেবে নিযুক্ত হন সালাউদ্দীন আইয়ুবি।

১১৭১ সালে সালাউদ্দীন শিয়া খিলাফত বিলুপ্ত করেন। ১১৮৭ সালে তিনি ক্রুসেডার কিংডমগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেন| এবং সেই বছরের ৪ জুলাই তিনি হাতিনের যুদ্ধে দুর্দান্ত বিজয় পান। ২ অক্টোবর জেরুজালেম আত্মসমর্পণ করে| শহরটি পুনরুদ্ধারের পর পরাজিতদের সাথে মানবতার উদাহরণ তৈরি করেন তিনি।

বিশাল বাহিনী নিয়ে জেরুজালেম অবরোধ করে রাখেন সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবি। তখন ক্রুসেডারদের থেকে এক দূত আসে তার কাছে। তিনি জানান, তাদের শর্ত যদি মানা না হয়, তাহলে জেরুজালেমের ভেতরে থাকা মুসলিমদের হত্যা করা হবে। ইসলামিক নিদর্শনগুলো ধ্বংস করা হবে।

সুলতান সালাহউদ্দীন শান্তির দিকে হাত বাড়ান। তিনি শর্ত দেন, খুব অল্প পরিমাণ অর্থ দিয়ে খৃস্টানরা শহর ছেড়ে যেতে পারবে| কেউ থেকে যেতে চাইলে সেটাও পারবে। এতে রাজি হয় ক্রুসেডাররা। এই চুক্তির মাধ্যমে বেঁচে যায় শহরের ভেতরে থাকা পাঁচ হাজার মুসলিমের জীবন। আর সরে যাওয়ার সুযোগ পায় খৃস্টান বাহিনী।

অথচ এর আট দশক আগের ঘটনাকে খৃস্টান ইতিহাসবিদরাই গণহত্যা হিসেবে অভিহীত করেছেন। ইতিহাসবিদ টায়ারম্যান তার ‘গডস ওয়ার: অ্যা নিউ হিস্ট্রি অব ক্রুসেড’ বইতে এ ঘটনাকে ‘চরম সহিংসতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য এক ইতিহাসবিদ পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, তখন মুসলমানদের রক্তে ক্রুসেডারদের ঘোড়াগুলো সাঁতার কাটছিলো।

টায়ারম্যান লিখেন, তাদের এই গণহত্যা কয়েকদিন ধরে চলেছিলো। এমনকি যেসব ইহুদি উপাসনালয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো ক্রুসেডারদের দেওয়া আগুনে তাদেরও মৃত্যু হয়েছিলো।

এই গণহত্যার ৮৮ বছর পর যখন মুসলমানরা জেরুজালেম ফিরে পেয়েছে, তখন খৃস্টানরা ছিলো আতঙ্কিত। সুলতান সালাহউদ্দীন তার প্রতিশ্রুতি রাখবেন কি না, এ নিয়েও ছিলো শঙ্কা। তাদের সেই শঙ্কাকে মিথ্যে প্রমাণ করে জেরুজালেমে একটি শান্তিপূর্ণ আত্মসমর্পন ঘটে।

চুক্তি অনুসারে ত্রিশ হাজার দিনার মুক্তিপন দিয়ে শহর ত্যাগ করে ক্রুসেডারদের অভিজাত বাহিনী। কিন্তু দরিদ্র সেনারা পণ দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলো না। তাদের পরিবার করুণা চেয়ে দেখা করতে আসে সুলতানের সঙ্গে।
ইতিহাসবিদ ম্যালকম ক্যামেরন লিয়ন্স তার ‘সালাদিন : দ্য পলিটিক্স অব দ্য হোলি ওয়ার’ বইতে লিখেছেন, সুলতান সালাউদ্দনি নিজেই শত শত খৃস্টানদের মুক্তিপণ পরিশোধ করেছেন। পরে শহর ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।

তবে মুসলিম ইতিহাসবিদরা লিখেছেন, শত শত নয় হাজার হাজার খৃস্টান সেনার মুক্তিপণের খরচ দিয়েছেন সুলতান নিজে। সুলতানের এই উদারতা দেখার পর, তার ভাই আল আদিলও এক হাজার খৃস্টানকে মুক্ত করে দেন।
হেরাক্লিয়াস এবং বালিয়ানের মতো খৃস্টান নেতারাও সুলতানের করুণা চেয়েছিলেন। সুলতান কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই আরও বারোশ জনকে মুক্তি দিয়েছিলেন। মুজাফফর আল-দীন ইবনে আলী কুচুকের অনুরোধে আরও এক হাজার বন্দিকে মুক্ত করা হয়। এছাড়া যারা মুক্তিপণ দিতে পারেনি এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের মুক্ত করে দেন তিনি। তাদেরকে নিরাপদে শহর ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ দেন।

ফিলিপো ডনভিটো তার গবেষণাপত্রে লিখেন, মুক্তিপণ দেওয়ার সামর্থ না থাকায় বিশ হাজার দরিদ্র খৃস্টানকে ক্ষমা করে দিয়েছেন সুলতান| এই উদারতার পর হাজার হাজার খৃস্টান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ১২ শতকের প্রেক্ষিতে এমন উদারতা ছিলো অকল্পনীয়। এ কারনেই সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবিকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব হিউম্যান রাইটস’ হিসেবে অভিহীত করা হয়।

তখনকার সময় ইউরোপ ও খৃস্টান বিশ্বে নারীদের মর্যাদা নাজুক ছিলো। যুদ্ধপরিস্থিতিতে তা আরো খারাপ ছিলো। অধিকাংশ পরাজিত নারীকে দাসত্ব মেনে নিতে হতো। কিন্তু এখানেও ইতিহাস গড়েছেন সুলতান। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। নারীর প্রতি তার বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। তিনি জেরুজালেমের সম্ভ্রান্ত নারীদের মুক্তিপণ ছাড়াই চলে যেতে দিয়েছেন। এক বাইজেন্টাইন সন্নাসিনীকে সহযোগীদেরসহ শহর ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।

বন্দী রাজা গাইয়ের স্ত্রী, জেরুজালেমের রাণী সিবিলাকে পূর্ণ সম্মান দিয়েছেন। মর্যাদার সাথে শহর ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। আত্মসমর্পণ চুক্তিতে খৃস্টানদের পাহারা দেওয়ার কোনো শর্ত ছিলো না। তারপরও সুলতানের সেনাবাহিনী খৃস্টানদের সুরক্ষা দেয়। জেরুজালেম থেকে দূরে সরে যাওয়া খ্রিস্টানদের নিরাপদ স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত সুরক্ষা অব্যাহত রাখেন।

সুলতান সালাহউদ্দীন প্রতিটি ধর্মের ওপর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি তার সঙ্গীদেরকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.) এর কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি শহর জয় করার পর চার্চকে খৃস্টানদের কাছেই রেখেছিলেন।
সুলতান সালাহউদ্দনি চার্চ অফ দ্য হলি সেপুলচার ধ্বংস করেননি। এর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ রেখে গেছেন।

তখনকার সময় বিজয়ী বাহিনী পরাজিতদের সম্পত্তি পুড়িয়ে দিতো। লুটপাট চালাতো। কিন্তু সুলতানের সেনাবাহিনী পরাজিতদের সম্পত্তির সুরক্ষা দিয়েছে।

হজরত ওমর (রা.)-এর জেরুজালেম বিজয়ের পর এই শহরের তিনটি প্রধান ধর্মই স্বাধীনতা ভোগ করতো। কিন্তু প্রথম ক্রুসেডের পর সেটা বাধায় পড়ে। ক্রুসেডাররা কপ্ট খৃস্টানদের প্রার্থনা করতে বাধা দিতো। সুলতান সালাউদ্দীন সেই বাধা তুলে দেন। তিনি অর্থোডক্স খৃস্টান এবং কপ্টদের একসাথে থাকতে এবং তাদের পছন্দ মতো উপাসনা করার অনুমতি দিয়েছিলেন। সুলতান কপ্টদের নিজের প্রজা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। যে কপ্টিক উপাসনালয়গুলো আগে ক্রুসেডারদের দখলে নিয়েছিল সেগুলো কপ্টিক পুরোহিতদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কপ্টদের চার্চ অফ দ্য হলি সেপুলচার এবং অন্যান্য খৃস্টান সাইট দেখার অনুমতি দেওয়া হয়। আবিসিনিয়ান খৃস্টানদের জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোতে ফি ছাড়াই যেতে দেওয়া হয়েছিল।

এইসব উদারতা তাকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব হিউম্যান রাইটস’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি সময়ের চাইতে এগিয়ে ছিলেন| বিশ্বকে দেখিয়েছেন মানবতা ও ক্ষমার প্রকৃত অর্থ। অসাধারণ মানবতাবাদী কাজ তাকে বানিয়েছে ইতিহাসের বিখ্যাত সুলতান। সহনশীলতার কারণে তিনি খৃস্টান বিশ্বেও জনপ্রিয়।

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...