এক প্রেমিক দম্পতি খুন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম গুলি

ইতিহাস4 months ago77 Views

একটা প্রেমের গল্প… এই গল্পের পরিণতি ডেকে এনেছিলো যুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।
একটামাত্র হত্যা… যা পাল্টে দিয়েছিলো পৃথিবীর রাজনীতি।
আজ আমরা জানবো, কিভাবে প্রেম ও খুনের ঘটনা থেকে বেজে উঠেছিলো যুদ্ধের সাইরেন।

এই গল্প শুরু হয় সেরাজেভো শহরে, যেখানে ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড, অস্ট্রিয়ান সম্রাটের উত্তরাধিকারী, এক সাধারণ মেয়ের প্রেমে পড়েন। কিন্তু তার প্রেম কেবল ব্যক্তিগত ছিল না—এটা হয়ে উঠে রাজনৈতিক।
স্ত্রী, সোফি। তিনি ছিলেন ফার্ডিনান্ডের জীবনের সবচাইতে শক্তিশালী মিত্র।

সোফিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়নি রাজপরিবার। ফার্ডিনান্ডের স্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করলেও রাজকীয় সুবিধা দেওয়া হয়নি তাকে। এমনকি স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলাও নিষেধ ছিলো তার জন্য।
বিষয়টি ছিলো প্রেমিক দম্পতির কাছে কষ্টের। তারপরও মেনে নিতে হতো রাজনিয়ম।

তাদের সংসারে কেটে গেলো প্রায় চল্লিশ বছর। সামনে তাদের চল্লিশতম বিয়েবার্ষিকী। দিনটিকে একটু ভিন্নভাবে উদযাপন করতে চাইলেন ফার্ডিনান্ড। তিনি ঠিক করলেন, বাইরে কোথাও যাবেন। যেখানে রাজকীয় নিয়ম মানতে হবে না। স্বামী-স্ত্রী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবিও তুলতে পারবেন।

অন্যদিকে রাজনীতিতে ঘনিয়ে উঠেছিলো গোপন খেলা। একটি গোপন সংগঠন ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ ছিলো এর পেছনের খেলোয়াড়। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো অস্ট্রিয়ান-হাঙ্গেরীয় শাসনের পতন।

ফার্ডিনান্ড এবং সোফির বাইরে কোথাও যাওয়ার কথা ছিলো, তারা গেলেন বসনিয়ায়। সেখানে তাদেরকে ভালোভাবে নেয়নি সবাই। এর কয়েক বছর আগে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি বসনিয়া-হারজেগোভিনা দখল করে নিয়েছিলো। এলাকাটা আগে ছিলো সার্বিয়ার। সার্বদের ব্যাপারে ফার্ডিনান্ড ও তাদের পরিবারের নিচু ধারণা ছিলো। তবে ফার্ডিনান্ড এই দখলের বিরোধীতা করেছিলেন। কিন্তু রাজকীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেননি। তিনি বলে দিয়েছিলেন- এই এলাকা দখল করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো বেড়ে যাবে। শেষে তার ধারণাই ঠিক হলো।

অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয় সাম্রাজ্যের অধীন বসনিয়ার অর্থনীতি দুর্বল হতে থাকে। কৃষকের ওপর নেমে আসে বঞ্চনা। শোষণের ভার নিতে পারছিলো না সার্বরা। এ কারণে তলে তলে অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক হতে থাকলো তরুণেরা। কৃষিজীবি ও ছাত্রদের নিয়ে গঠন হলো ‘ইয়ং বসনিয়ানস’ নামে গোপন বিপ্লবি বাহিনী। ফার্ডিনান্ডের এই সফরকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিলো তারা।

তখন মে মাস চলছে

গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ, ত্রিফকো গ্র্যাবেজ এবং নাদেলিকো কাব্রিনোভিচ নামের তিন বিপ্লবি চলে গেলো সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে। ওখানে ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ নামের এক সংগঠন থেকে নিয়ে এলো ছয়টি হাতবোমা, চারটি সেমি অটোমেটিক পিস্তল। সাথে নিলো সায়ানাইড সুইসাইড ক্যাপসুল।

অস্ত্রগুলো নিয়ে এরা অনুশীলন করতে থাকে বেলগ্রেডের এক পার্কে। এরপর ফিরে যায় বসনিয়া- হারজেগোভিনায়। ওদেরকে নিরাপদে পৌঁছে দিতে সহযোগিতা করে ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’। এই গোষ্ঠিটির সাথে সার্ব সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ছিলো।

সেদিন ছিলো জুন মাসের ২৩ তারিখ, ১৯১৪ সাল

সোফিকে নিয়ে বসনিয়া-হারজেগোভিনার দিকে রওনা হন ফার্ডিনান্ড। যাওয়ার আগে তার কাছে ছিলো গোয়েন্দা তথ্য। গোয়েন্দারা তাকে সফর স্থগিত করতে বলেছিলো। কিন্তু স্ত্রীর সাথে ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারেননি ফার্ডিনান্ড।
তিনি রওনা দিলেন। এই যাত্রা যে ঝুঁকিতে ভরপুর, সেটাও মাথায় রাখলেন।

বসনিয়ার-হারজেগোভিনার রাজধানী সারায়েভো থেকে কয়েক মাইল দূরে একটি স্পা টাউনে যান তারা। ওখানে গিয়েই সামরিক দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যান ফার্ডিনান্ড। স্ত্রী সোফি ব্যস্ত থাকেন স্কুল ও এতিমখানা পরিদর্শনে। প্রথমবারের মতো সুযোগ পেয়ে অনেক অনেক ছবি তুলে নেন তারা।

এভাবেই কেটে যায় কয়েকটা দিন। এবার বাড়ি ফিরবেন প্রেমিক দম্পতি। আর মাত্র একটা দিন বাকি-

কিন্তু সেই দিনটা ছিলো বদলে দেওয়া দিন
একটি গোপন নিশানা, গাভ্রিলো প্রিন্সিপ, একজন যুবক, পিস্তল চালিয়ে দেন ওইদিনে — সেই ঘন্টায় — যা বিশ্ব ইতিহাসে দাগ কেটে যায়।

২৮ জুন, ১৯১৪। ভোরে বড় ছেলেকে টেলিগ্রাম পাঠান ফার্ডিনান্ড। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করায় ছেলেকে অভিনন্দন জানান।
এরপর সেনাপরির্দশনে যান তিনি। দায়িত্ব শেষে একটি ছাদখোলা গাড়িতে চড়েন। গাড়িবহর চলতে থাকে। এই বহরের সামনে ছয়জন প্রশিক্ষিত সিকিউরিটি থাকার কথা থাকলেও ওই সময় ছিলো একজন। সাথে ছিলেন স্থানীয় তিন পুলিশ কর্মকর্তা।

ফার্ডিনান্ডের বহরের অপেক্ষায় উৎ পেতে থাকে ‘ইয়ং বসনিয়ানস’ এর সাত বিপ্লবি।
বহর যখন অ্যাপেল কোয়ে এলাকায় পৌঁছে, তখন বোমা ছুঁড়ে মারেন কাব্রিনোভিচ। কিন্তু ওই বিদ্রোহীর বোমা গিয়ে পড়ে ফার্ডিনান্ডের পেছনের গাড়িতে। এতে আহত হন দুই সেনাকর্মকর্তা ও সাত বাইস্ট্যান্ডার। গাড়ির গতি বেশি থাকায় টার্গেট থেকে বেঁচে যান ফার্ডিনান্ড ও সোফি। তারপরও সারায়েভো ছাড়েননি তারা। যেমন সূচি ঠিক করা ছিলো তেমনভাবেই আনুষ্ঠানিকতা পালনের সিদ্ধান্ত নেন। তবে পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আনেন। সেইসাথে জানিয়ে দেন, বোমায় আহত সেনাদের দেখতে হাসপাতালে যাবেন তারা।

নতুন পরিকল্পনার কথা তখনো জানানো হয়নি গাড়ির চালককে। পুরনো পরিকল্পনা অনুযায়ীই চলতে শুরু করলো ছাদখোলা গাড়ি। অ্যাপেল কোয়ের সড়ক ধরে তুমুল গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলো বহর।
ফ্রাঞ্জ জোসেফ নামের এক সড়কের মুখে এসে গাড়িচালক সেদিকে মোড় নেন। ফার্ডিনান্ড তখন চালককে নতুন পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি অ্যাপেল কোয়ের সড়কে ফিরে যেতে বলেন।
অন্যদিকে টার্গেট মিস করে বিপ্লবিরা হতাশ। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে নানাদিকে।

তবে গ্যাব্রিল প্রিন্সিপ নামের এক বিপ্লবি তখনো দাঁড়িয়েছিলেন ফ্রাঞ্জ জোসেফ মোড়ে। ১৯ বছর বয়সি রোগা-পটকা এই তরুণ, দরিদ্র কৃষকের ঘরে জন্ম। চরম হতাশা নিয়ে এদিক ওদিক চোখ রাখছিলেন তিনি।

হঠাৎ তার চোখ জ্বলে উঠলো। সামনে রাজকিয় গাড়িবহর। ফার্ডিনান্ডের গাড়িটি তার হাতের নাগালেই। গলির মুখে এনে ঘোরানো হচ্ছে। দূরত্ব মাত্র চার বা পাঁচ গজ।
পরপর দুইটি গুলি ছুঁড়েন প্রিন্সিপ। এবার অব্যর্থ নিশানা। গুলিবিদ্ধ হন ফার্ডিনান্ড ও সোফি।

একটি গুলি বিঁধে যায় ফার্ডিনান্ডের ঘাড়ে। অন্যটি সোফির পেটে। দুইজনই গুরুতর আহত।

ফান্ডিনান্ড নিজের কথা ভাবলেন না। স্ত্রীর অবস্থা নিয়ে শঙ্কিত। তিনি প্রিয়তমাকে বললেন, ‘সোফি, তুমি মরে যেও না। আমাদের সন্তানদের জন্য হলেও বেঁচে থেকো।’

কিন্তু বেঁচে থাকতে পারলেন না সোফি। হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয় ফার্ডিনান্ডেরও।

মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগেও ছবি তুলেছিলেন এই দম্পতি। এতে দেখা গেছে সারায়েভো টাউন হল থেকে ছাদখোলা গাড়িতে উঠছেন তারা।

এদিকে ঘটনাস্থল থেকেই ধরা পরেন প্রিন্সিপ। উপস্থিত জনতা তাকে ঘিরে ধরেছিলো। জনতার সাথে ধস্তাধস্তি করেন তিনি। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। মামলা যায় আদালতে।

আদালতে তিনি বলেন- ‘ আমি এক খারাপ লোককে হত্যা করেছি। আমি অপরাধী নিই।’

রাজনৈতিক কারণে নাহয় ফার্ডিনান্ডকে খারাপ লোক ধরেই নেওয়া গেলো। কিন্তু সোফিও কি খারাপ ছিলেন?
প্রিন্সিপ বলেন, ‘সোফিকে মারার পরিকল্পনা ছিলো না আমার। আমি কেবল ফার্ডিনান্ডকেই মারতে চেয়েছিলাম।’
এই অপরাধে ২০ বছরের দন্ড পেয়েছিলেন প্রিন্সিপ। ওই সময় মৃত্যুদন্ড দিতে হলে আসামির যে বয়সের দরকার হতো, প্রিন্সিপের বয়স ছিলো তার চাইতে তিন সপ্তাহ কম।

প্রিন্সিপের ইতিহাস শেষ হয় যক্ষ্মা রোগের মাধ্যমে। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯১৮ সালে তার মৃত্যু হয়।

ফার্ডিনান্ড দম্পতিকে হত্যার এক মাস পর, ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এই হত্যায় সার্বিয়াকে দায়ী করে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এর আগে ২৩ জুলাই অস্ট্রিয়ান রাষ্ট্রদূত সার্বিয়ান সরকারের কাছে চরমপত্র পাঠান। এতে স্থানীয় জাতীয়তাবাদীদের নির্মূল করার শর্ত দেওয়া হয়। জুড়ে দেওয়া হয় আরো কঠিন কঠিন শর্তও। পাশাপাশি এর জবাব দেওয়ার জন্য বেঁধে দেওয়া হয় ৪৮ ঘণ্টা সময়।

সার্বিয়ার সামনে খোলা ছিলো দু’টি পথ। হয় অস্ট্রিয়ার বশ্যতা স্বীকার করা, নয় অস্ট্রিয়াকে প্রতিরোধ করা।
চরমপত্র পাঠানোর দুইদিন পর যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয় রাশিয়া। ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি।
এরপর একে একে লড়াইয়ে যোগ দেয় বাকি পরাশক্তিগুলো। পুরোদমে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

মূলত, প্রেমিক দম্পতির মৃত্যু ছিলো যুদ্ধের প্রথম গুলির মতো।

প্রেম আর খুনের সেই গল্প আজও আমাদের শেখায়— একজন মানুষের ছোট একটা সিদ্ধান্ত কীভাবে উলট-পালট করে দিতে পারে পৃথিবীকে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেবল যুদ্ধ ছিলো না, এটি ছিলো মানুষের আবেগ, প্রতিশোধ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও ইতিহাসের কালো মোড়।

আমরা এখনো দাঁড়িয়ে আছি, সেই মোড়ে। এখনো কানে এসে ঠেকে অতীতের সেই পিস্তলের আওয়াজ।

স্ক্রিপ্ট: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

উপস্থাপনা: মশিউর কায়েস

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...