তাহসিফ সাউরি এবং কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন, কী ছিলো তার অপারগতা?

নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর ঢাকার উত্তরখান এলাকায় তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ

২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পাঁচ তারিখ। শেখ হাসিনা রেজিমের বিরুদ্ধে উত্তাল রাজপথ। দুপুরের দিকে খবর ছড়িয়ে পড়লো- পালিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেলো পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটির একটি জানালা থেকে ধারণ করা হয়েছিলো ভিটিওটি। বলা হয়ে থাকে, ওই ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। আগস্ট মাসের শেষের দিকে বিমান বাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে। পরে তার অবস্থান নিয়ে তৈরি হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে তিনি দুর্লভ সেই সময়ের ভিডিও প্রকাশ করেছেন, ওই ভিডিওটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে; অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব আইনে তার বহিষ্কার ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে বিতর্ক। সবশেষ তার রহস্যজনক মৃত্যু সেই বিতর্ক আরো উসকে দিয়েছে।

নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর ঢাকার উত্তরখান এলাকায় তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ। আগস্টের পাঁচ তারিখ ওই ভিডিওর জন্য তিনি পেয়েছিলেন নায়কোচিত প্রশংসা। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিলো বলেও তোলা হয়েছে অভিযোগ। আসলে কী ছিলো তার ভূমিকা?

চব্বিশের বিপ্লবের পরপরই প্রশ্ন উঠেছিলো, এই ঐতিহাসিক ভিডিও ছড়িয়েছিলেন কে? পরে বিমানবাহিনীর ভেতরের তদন্ত ও এয়ার ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষণে আসে দুটি নাম। কুর্মিটোলা এয়ারবেইসের অফিসার্স মেসের একটি কামরা থেকে দৃশ্যটি ধারণ করেছিলেন প্রশাসন শাখার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী। সেই ভিডিও নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি।

পরে বিমানবাহিনী থেকে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। আইএসপিআর-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিমানবাহিনীর প্রচলিত নিয়ম ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাদের অবসর দেওয়া হয়েছে। ওই সময় দেশে ছিলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে থাকা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু সাউরির বিরুদ্ধে ওই পদক্ষেপ রাজনৈতিক কোনো সিদ্ধান্ত ছিলো না।

সশস্ত্র বাহিনীর আইন অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা চাকরিরত অবস্থায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সংবেদনশীল এলাকায় ভিডিও বা আলোকচিত্র ধারণ করতে এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন না। সামরিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি থেকে, এই ঘটনাকে প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন ও তথ্য নিরাপত্তা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

মৃত্যুর তিন মাস আট দিন আগে, গত জুলাই মাসের ২১ তারিখ- ‘Speak With Rashid’ নামের এক ইউটিউব পডকাস্টে মুখ খুলেছিলেন তাহসিফ সাউরি। সেসময় তাকে ঘিরে চলা বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন সাউরি।

উপস্থাপকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, “আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি বা ছড়িয়েও থাকি- হোয়াট ইজ দ্য প্রুফ দে আর হ্যাভিং? এটাও হতে পারে, এজন্যই হয়তো আমি আজ এয়ারফোর্সে নেই।”

ওই পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন- যে ঘটনাগুলো ওই সময় ঘটেছিল, সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপারগতা আছে।

তাহসিফ সাউরির বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিলো, বিমানবাহিনীর ভেতরে থাকা ‘র’-এর একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ওই ভিডিওটি প্রথমে ভারতীয় কোনো গণমাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল। তবে পডকাস্টে এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘হাস্যকর ও অপ্রাসঙ্গিক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তাহসিফ।

তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়- ভিডিও বাইরে আসার পেছনে সত্যিই কি কোনো ভূরাজনৈতিক শক্তির হাত ছিল? নাকি ছিলো তরুণ ওই কর্মকর্তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ?

গত ২৭ অক্টোবর রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন তাহসিফ সাউরি। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকালে ‘জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯’-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন।

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কেএসএম ইনতিসার ইনজামাম ফেসবুকে এক চাঞ্চল্যকর পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “হাসিনার ভিডিও ভাইরাল করার সঙ্গে জড়িত এই ছেলেটার লাশ আজকে তুরাগ নদীতে ভেসে আসছে।” মরদেহের হাতে কাদা থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তিনি।

একে নিছক দুর্ঘটনা মানতে নারাজ ইনজামাম। বিষয়টির পেছনে গভীর বিরোধের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

কী ছিলো সেই বিরোধ? এই প্রশ্নের সমাধান কী? তাহসিফ সাউরিকে ঘিরে শেষ না হওয়া প্রশ্নগুলো এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে-

তিনি কি কেবল বিমান বাহিনীর শৃঙ্খলাই ভেঙেছেন? ওই ভিডিওটা কি ছিলো তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ? নাকি এর পেছনে ছিলো অন্যকিছু? এর সঙ্গে কি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সংযোগ ছিলো? আর এখন তার মৃত্যুই হলো কীভাবে? কী ছিলো তার অপারগতা?

সব প্রশ্নের শেষে আরো একটা প্রশ্ন- এই প্রশ্নগুলো কি অমীমাংসিতই থেকে যাবে?

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...