‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভারত ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত হিসেবেও তার গান বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে চলছে বিতর্ক। অভিযোগ করা হচ্ছে, তিনি এই গান লিখেছিলেন বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করে। এই অভিযোগ কতোটা সত্য? তিনি কি আসলেই গগন হরকরার সুর চুরি করেছেন? বিস্তারিত পড়ুন ইনফোজা প্রতিবেদন।

‘আমার সোনার বাংলা’ কখন লেখা হয়েছে, এর সঠিক সময় জানার পক্ষে স্পষ্ট কোনো দলিল পাওয়া যায় না। তবে সত্যেন রায়ের এক লেখা থেকে জানা যায়, ১৯০৫ সালের আগস্ট মাসের সাত তারিখ কলকাতার টাউন হলে একটি প্রতিবাদ সভা হয়। এতে প্রথম এই গানটি গাওয়া হয়েছিলো। ওইসময় চলছিলো বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। এই আন্দোলনের বিপরীতে দুই বাংলা এক রাখার পক্ষে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি লিখেছিলেন তিনি।
ওই বছর সেপ্টেম্বরের সাত তারিখ সঞ্জীবনী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বাক্ষরে গানটি ছাপা হয়। একই বছর ছাপা হয়েছিলো বঙ্গদর্শন পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায়। তবে সাত আগস্টের প্রতিবাদ সভায় গানটি প্রথম গাওয়া হয়, এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে ভিন্ন মত দিয়েছেন প্রশান্ত কুমার পাল। তিনি রবীন্দ্রনাথের জীবনি লিখেছেন। আমার সোনার বাংলা গানটি ১৯০৫ সালের ২৫ অগস্ট কলকাতার টাউনহলে ‘অবস্থা ও ব্যবস্থা’ শীর্ষক প্রবন্ধ আসরে প্রথম গাওয়া হয়েছিলো বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এই গানটিতে গগন হরকরা নামের এক বাউলের গানের সুর অনুকরণ করা হয়েছে। বাউল গগন চন্দ্র দাস ছিলেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহের এক ডাকপিয়ন। শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে আসার সুবাদে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার পরিচয় ছিলো। তিনি পথে-ঘাটে গান গেয়ে বেড়াতেন। তার গান ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ রবীন্দ্রনাথের ভালো লেগে যায়। পরে সেই সুরের খাপেই তিনি বসিয়ে দেন ‘আমার সোনার বাংলা’।
বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে স্বাদেশি আন্দোলনের সময় জনপ্রিয় ছিলো গানটি। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী রাজনীতিতে গানটি ব্যবহার হয়। বিশ শতকের বিশের দশকে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ স্তিমিত হয়ে এই এই গানের প্রচলন কমে যায়।
দীর্ঘ সময় পর গানটিকে সামনে নিয়ে আসেন জহির রায়হান। ১৯৭০ সালে ‘জীবন থেকে নেওয়া’ সিনেমায় গানটি ব্যবহার করেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের সভায় ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া হয়। ফেব্রুয়ারিতে রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে একসেট রবীন্দ্র গানের রেকর্ড উপহার দিয়েছিলেন শিল্পী কলিম শরাফী। রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের সাত মার্চের ভাষণের আগেও গানটি গাওয়া হয়।
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার এই গানকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত পরিবেশন হতো গানটি। ওই সময় এর যন্ত্রসুর করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরকার অজিত রায়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন হলে এর ৪.১ অনুচ্ছেদে ‘আমার সোনার বাংলা’র মোট পঁচিশ চরণ থেকে প্রথম ১০ চরণ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে যোগ করা হয়।